kalerkantho


রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়

স্কুলের রুমে ক্লাস, শিক্ষক কোয়ার্টারে ছাত্রাবাস

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্কুলের রুমে ক্লাস, শিক্ষক কোয়ার্টারে ছাত্রাবাস

শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের এই ভবনের দুই কক্ষে চলছে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি বেসরকারি স্কুলের দুটি ক্লাসরুম আর শিক্ষক কোয়ার্টারে চলছে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ওই দুটি রুমে ক্লাস হয়; আর কোয়ার্টারকে বানানো হয়েছে ছাত্রাবাস। দুই বছর ধরে এভাবেই চলছে দেশের ৩১তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে। তবে ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৩ সালে। কথা ছিল, শিগগির নিজস্ব ক্যাম্পাস হবে। বাস্তবে এখনো তা হয়নি। পরে চালু হয়েও রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে, অথচ পার্বত্যাঞ্চলের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

অবকাঠামো ছাড়াই যাত্রা শুরু

বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে কিন্তু নিজস্ব ভবন, ক্লাস রুম এখনো নেই। ব্যবস্থাপনা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে ১০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়।

ইতিমধ্যে দুটি ব্যাচে ২০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, আরেকটি ব্যাচ ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ। সবাইকে ক্লাস করতে হয় শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দুটি ক্লাসরুমে। এক ব্যাচ ক্লাস করলে অন্য ব্যাচ দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের মাঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস শহরের আরেক প্রান্তে ভেদভেদি এলাকায় উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউসে। আবার এর ভর্তি পরীক্ষা হয় ঢাকায়।

বিতর্কের কেন্দ্রে উপাচার্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করা হয়। ইউএনডিপির কনসালট্যান্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। তবে বিভাগীয় প্রধান, ডিন বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপকীয় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই তাঁর। হঠাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। অনভিজ্ঞতা আর ভীতু স্বভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে গতি আনতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। যথাসময়ে উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সেশনজট বেঁধেছে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে আত্মীয়স্বজন ও নিজ এলাকার লোকদের প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক তদবিরে অযোগ্য লোক নিয়োগ করেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশ হচ্ছে না।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে গোষ্ঠপ্রীতি, আঞ্চলিকতা ও স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ। তাঁর অপসারণ দাবি করে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ।

ভাগ্যবান উপরেজিস্ট্রার

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি পদে নিয়োগের জন্য গত ২৬ জুন একটি ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু উপরেজিস্ট্রার পদে অঞ্জন কুমার চাকমাকে নিয়োগ দেওয়া হয় সরাসরি সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে। যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নিয়োগ পান, সেই বিজ্ঞপ্তির অন্যান্য পদের ভাইভা বোর্ডে ছিলেন ‘ভাগ্যবান’ উপরেজিস্ট্রার। উচ্চতর ডিগ্রিধারী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

কোটা মানা হচ্ছে না

শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য তিন জেলার সব নিয়োগে ‘উপজাতি’, ‘অ-উপজাতি’ কোটা মানার বিধান রয়েছে। সাধারণত ‘উপজাতিদের’ জন্য ৬০ শতাংশ ও ‘অ-উপ-জাতিদের’ জন্য ৪০ শতাংশ কোটা মানা হয়। পাহাড়ের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। ‘উপজাতিদের’ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতও মানা হচ্ছে না।

আরাফাত নামের এক ছাত্র ফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি, মনির নামের এক ভাই প্রাণ হারিয়েছে। আজ আমাদের জন্যই কোটা নেই!’

ভাড়ার ভবনে সব কাজ

অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। নিজস্ব ক্যাম্পাসের কাজ থমকে আছে। কাজ চালানো হচ্ছে ভাড়ার ভবনে বা স্থাপনায়। রাঙামাটিতে উন্নয়ন বোর্ডের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালানো হচ্ছে। শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টার ও ক্লাসরুম ভাড়া নিয়ে ছাত্রাবাস ও শ্রেণি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বেইন টেক্সটাইলসের মালিকের বাসা ভাড়া নিয়ে ছাত্রীদের হোস্টেল বানানো হয়েছে। ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসও চলছে ভাড়া বাসায়। ভাড়া বাবদ শাহ উচ্চ বিদ্যালয়কে মাসে ৫৪ হাজার টাকা, বেইন টেক্সটাইলসকে ২৭ হাজার টাকা ও লিয়াজোঁ অফিসের জন্য প্রায় ২৭ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।

খাগড়াছড়িকরণের অভিযোগ

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলেও এখানে নিয়োগে বঞ্চিত হচ্ছে রাঙামাটি ও বান্দরবানের লোকজন। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগের বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলায়। উপাচার্যের নিজের জেলা খাগড়াছড়ি। এ কারণেই এ রকমের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ। বান্দরবানের কেউ নিয়োগ পাননি। ক্ষুব্ধ বান্দরবানবাসী নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। রাঙামাটি থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র তিনজনকে। ভর্তির ক্ষেত্রেও এলাকাকেন্দ্রিক অনিয়মের অভিযাগ রয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কয়েক জন শিক্ষার্থীকে বিশেষ বিবেচনায় ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

গোষ্ঠীপ্রীতির অভিযোগ

এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদেও মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালি বা অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

রাঙামাটি ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝিনুক ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করছেন উপাচার্য। তিনি চাকমা ছাড়া আর কাউকে নিয়োগ দিচ্ছেন না। তিনি একটি গোষ্ঠীর ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছেন। আমরা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাঁর অপসারণ দাবি করছি। ’

মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থার (মাসাস) কেন্দ্রীয় সভাপতি অংসুচাইন চৌধুরী বলেন, ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকে পার্বত্য এলাকার নিয়োগে সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ করা আছে। কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিয়োগে প্রাধান্য দিলে তা চুক্তিপরিপন্থী কাজ হবে। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ’ পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আলকাচ আল মামুন ভূইয়া বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকদের নিয়োগ দিয়ে একটি নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছেন উপাচার্য। তাঁকে বহাল রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা তাঁর অপসারণ দাবি করছি। ’

ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে কৌশল

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সারা দেশের শিক্ষার্থীরা যাতে আবেদন করতে না পারে, সেজন্য ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় চট্টগ্রামভিত্তিক আঞ্চলিক পত্রিকায়। এর ফলে প্রথম বছরের তুলনায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে ভর্তির আবেদন অনেক কমে যায়।

ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর জন্য গঠিত হয়েছিল রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ। এর আহ্বায়ক সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, “এটি আমাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়। এর সঙ্গে পার্বত্যাঞ্চলবাসীর আবেগ জড়িত। কিন্তু ভিসি যা করছেন তা লজ্জার, ঘৃণার। তাঁর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি হতাশার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি তাঁকে অপসারণ করা যায় ততই মঙ্গল। তিনি কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সাম্প্রদায়িক খোঁয়াড়’-এ পরিণত করছেন। ”

উপাচার্যের বক্তব্য

সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপাচার্য ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে দেরি হচ্ছে। এক মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে। কোটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই সার্কুলার (বিজ্ঞপ্তি) দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের জন্য পৃথক কমিটি আছে। তাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরাও থাকেন। এতে তাঁর কিছু করার নেই। ভর্তির ক্ষেত্রেও কোনো অনিয়ম হয়নি। নিয়োগে খাগড়াছড়িকরণের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সেখান থেকে বেশি আবেদন জমা পড়েছে; অন্য দুই জেলা থেকে আবেদন জমা না পড়লে কী করার আছে!


মন্তব্য