kalerkantho


পিতার হুকুম মাতা ও পুত্রের জন্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পিতার হুকুম মাতা ও পুত্রের জন্য

এই বইয়ের আটটি প্রবন্ধের মধ্যে দুটি লিখিত হয়েছিল বত্তৃদ্ধতার প্রয়োজনে। ‘ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক পরাজয়’ প্রবন্ধটি বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সুবর্ণ জয়ন্তী (২০১৬) উপলক্ষে আমি পাঠ করেছিলাম। ‘তব গৃহ নহে অন্ধকূপ’ও একটি বক্তৃতা। এটি ছিল ‘সেলিনা বাহার জামান স্মারক বক্তৃতা (২০০৬)’। তৃতীয় রচনাটি, ‘পিতৃতান্ত্রিকতা অবরোধ ও ইতিহাসের মুক্তি’, স্বতন্ত্রভাবে লেখা। তিনটি মিলে একটি বক্তব্য তৈরি হয়েছে, এই বিবেচনায় তাদের একত্র করে এ বই। মূল বিষয়টি হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিকতা, তাই এর নাম দিয়েছি ‘পিতার হুকুম মাতা ও পুত্রের জন্য’। পিতাই হুকুম দেন, মাতা শোনেন, তা মাতারা যে ভূমিকাই পালন করুন না কেন। ব্যাপারটা এখনো এই রকমেরই। উন্নতি অনেক হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাটা বদলায়নি। বাংলাদেশে তো এখন মেয়েরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক বিপদে আছে।

একাত্তরের যুদ্ধের সময়টা আলাদা, সেই পরিস্থিতির বাইরে মেয়েরা আগে কখনো এতটা ঝুঁকিতে থাকেনি, এখন যেমনটা রয়েছে। গণধর্ষণের খবর আগের দিনে যে ছিল না তা নয়, তবে সেটা ছিল বিরল, এখন গণধর্ষণ ঘটছে যত্রতত্র। মেয়েরা বিদেশে পাচার হচ্ছে, হয়রানির শিকার হচ্ছে পথেঘাটে, অফিসে-কারখানায়, যখন-তখন শিকার হচ্ছে সহিংসতার। নিরাপদে নেই তারা এমনকি নিজ গৃহেও। অনেকের তো গৃহই নেই। এই দুর্দশার অবসান ঘটবে না, যদি না পুঁজিবাদকে ভেঙে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা যায়।

এই বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটিতে সাহিত্যে পিতৃতান্ত্রিকতার উপস্থিতির কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। এতে রবীন্দ্রনাথ থেকে অনেক কটি উদ্ধৃতি আছে। গভীর বেদনা ও আক্ষেপের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দেশমাতৃকাকে উদ্দেশ করে একদা বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালী ক’রে মানুষ করোনি। ’ স্নেহ ও প্রশ্রয় দিয়ে এই মা তাঁর সন্তানদের মানুষ হয়ে-ওঠার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন—এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়।

শিশুর মনে সকালবেলার পাখির কলরব তুলে সবার আগে জেগে-ওঠার ইচ্ছাকে মা দমিত করেছেন, বলেছেন হয়নি সকাল, ঘুমো; এ ঘটনা নজরুলের কবিতায় সত্য ছিল, মিথ্যা ছিল না বাস্তব জীবনেও। তবে পেছনের কঠিন সত্য তো এটাও যে, মা নিজেও বন্দি ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজের হাতে। মাতৃমুক্তিপণ আসলে পিতৃতান্ত্রিকতাকে ভাঙার জন্যই প্রয়োজন। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার—সবখানেই পিতা হচ্ছেন কর্তা, হুকুম তিনিই দেন; সেই হুকুম মাতা মানেন, সন্তানরাও মেনে চলেন।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটেছে, কিন্তু বিদ্রোহীরা যে সব সময় পিতৃতান্ত্রিকতার বলয়ের বাইরে যেতে পেরেছেন, এমন নয়। বিদ্রোহের দরুন রাষ্ট্র ভাঙলেও নারীর মুক্তি ঘটেনি। ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রাণ দিয়েছেন ক্ষুদিরাম। সরকার তাঁকে ফাঁসি দিয়েছে। ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে অনেক গান লেখা হয়েছে। সর্বাধিক মর্মস্পর্শী গানটি হচ্ছে ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। সেখানেও দেখা যাচ্ছে যে পুত্রসন্তানটি তার মাকে এই বলে আশ্বস্ত করছে, মায়ের জন্য সে একটি বউ সংগ্রহ করে আনবে, মা যাকে নির্বিঘ্নে দাসী করতে পারবেন। এই প্রতিশ্রুতিতে পূর্বাভাস আছে এমন সম্ভাবনার যে স্বাধীন দেশেও মেয়েরা পরাধীন থাকবে। বলা বাহুল্য, এই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়নি।

সতীদাহের বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায়ের অবস্থান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু রামমোহনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ পাওয়া গেছে যে নিজের মায়ের তিনি উপযুক্ত যত্ন নেননি। তা ছাড়া শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ তাঁকে যে রাজা উপাধি দিয়েছিলেন, রামমোহন সেই মুকুট পরিত্যাগ করেননি, বহন করেছেন গর্বের সঙ্গে। মাতৃভক্তিতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হচ্ছেন আদর্শ দৃষ্টান্ত। অনেক ব্যাপারেই তিনি অসাধারণ, নিজের মায়ের প্রতি কর্তব্যপালনের ব্যাপারেও বটে।

অনেক দিক দিয়েই বিদ্যাসাগর হচ্ছেন ব্যতিক্রম। বিধবাদের দুঃখে তিনি কেবল সহানুভূতিই জানাননি, তাদের দুঃখ নিবারণে তাঁর কাজ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। বিধবাদের বঞ্চনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও মর্মে মর্মে অনুভব করেছেন। তবে উপন্যাসে তিনি যে বিধবাদের বিবাহ দেবেন, এমন পদক্ষেপ কিন্তু নেননি। তাঁর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসে বিধবা রোহিণী অত্যন্ত জীবন্ত, কিন্তু সে যে পুনরায় বিবাহিত হবে, এমন অধিকার ঔপন্যাসিক তাকে দেননি; উপরন্তু প্রেমিকের সঙ্গে থাকতে গিয়ে ওই নারী বিবেচিত হয়েছে পাপিষ্ঠা বলে।

সান্ত্বনা, প্রশংসা, করুণা—কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয় না, কেননা ব্যবস্থাটা রয়ে যায়। ব্যবস্থাটা বৈষম্যমূলক। বঞ্চিত নারীদের জন্য সেটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক। নির্বিশেষে না হলেও তারা বিশেষভাবে পীড়িত বৈকি। এই সত্যের কথাটাই বইটি জুড়ে ব্যাপ্ত রয়েছে।

‘জননীর পাশে শওকত ওসমান’ প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে শওকত ওসমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে (২০১৭)। ‘আমার পিতার মুখ’ আমি লিখেছিলাম ১৯৬৯ সালে, আমার পিতার মৃত্যুর পরে। ‘আমার মা’ রচনাটি একটি সাক্ষাত্কার, প্রকাশিত হয়েছে মাসিক অনন্যা পত্রিকায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে।

লেখাগুলো একত্র করার কারণ রয়েছে, এদের ভেতরকার আত্মীয়তার আত্মীয়তাটা বিষয়বস্তু। বইটি বের করেছে জয়তী প্রকাশন, প্রচ্ছদ করেছেন শতাব্দী জাহিদ, মূল্য ৩০০ টাকা।


মন্তব্য