kalerkantho


পাতিনেতাদের আশ্রয়ে নকল বই বাণিজ্য

আপেল মাহমুদ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাতিনেতাদের আশ্রয়ে নকল বই বাণিজ্য

ভারতের যশ-খ্যাতিসম্পন্ন লেখকদের কোনো বই সে দেশে প্রকাশের প্রস্তুতি চলার সময়েই ঢাকার নীলক্ষেতে সেটি মলাটবদ্ধ আকারে বের হয়ে যায়। বিশেষত কলকাতার সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতিমান লেখকদের বই নকলের ক্ষেত্রে নীলক্ষেতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। পাশাপাশি বিভিন্ন পাঠ্য বই, মেডিক্যালের দামি প্রকাশনা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল এমনকি সংবিধান পর্যন্ত পাইরেসির শিকার হচ্ছে। নামকরা জনপ্রিয় লেখকদের নামে অন্যের বস্তাপচা লেখা চালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আর নীলক্ষেতকেন্দ্রিক এমন অপকর্ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও তা রোধে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-পাতিনেতাদের আশ্রয়ে বাধাহীনভাবেই চলছে নকল বইয়ের এ বাণিজ্য।

জানা গেছে, ঢাকার বাজারে এমন পাইরেসির ঘটনা ভারতের সংশ্লিষ্ট লেখকরাও অবগত। কয়েক বছর আগে সে দেশের একজন জনপ্রিয় লেখক ঢাকায় এসে দেখেন তাঁর অনুমতি ছাড়াই সব বই ছাপিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। সমরেশ মজুমদার ঢাকায় এসে একবার তাঁর নামে একটি বইয়ের সন্ধান পান, যেটি তিনি লেখেননি। তাঁর নাম দিয়ে অন্য একটি কাহিনি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন অসাধুতা বন্ধে প্রথম দিকে চেষ্টা করলেও কোনো ফল মেলেনি।

এখন আর এ নিয়ে তাঁরা কোনো কথাবার্তা বলেন না।

নীলক্ষেতের সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসায়ী মোস্তফা হোসেন বলেন, ‘বই পাইরেসির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটা হলো এসব বইয়ের প্রুফ ঠিকমতো দেখা হয় না। ফলে পুরো বই থাকে ভুলভ্রান্তিতে ভরা। অনেক সময় বইয়ের পাতা কমাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়। কম দামি কাগজ ছাড়াও নিম্নমানের বাঁধাইয়ের কারণে এ ধরনের বই কয়েক দিনের মধ্যেই পড়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। এসব বই কম টাকায় কিনে পাঠকরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছে। ’

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, নীলক্ষেতে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক পাইরেসির শিকার হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় সংবিধান। সরকারের অনুমতি ছাড়া সংবিধান ছাপানো দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও একাধিক চক্র তা নকল করে বাজারে বিক্রি করছে। নীলক্ষেতের টিপু নামের এক ব্যক্তি সংবিধানের হুবহু কপি ছেপে বাজারে বিক্রি করছেন। পাশের ইসলামিয়া মার্কেটের মঈন’স পাবলিকেশন্স থেকে পঞ্চদশ সংশোধনীসহ বাংলাদেশের সংবিধান নামে তা ছাপা হয়েছে। এ ব্যাপারে পাবলিকেশনেসর স্বত্বাধিকারী মো. মঈনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সংবিধান ছাপানোর বৈধ অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।

নীলক্ষেতে প্রবীণ বই ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, ‘বই নকল বা পাইরেসি যা-ই বলুন না কেন, সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-পাতিনেতারা। তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এখানে বিভিন্ন পাঠ্য বই, সৃজনশীল বই কিংবা মেডিক্যাল বই দেদার নকল হচ্ছে। টাকা না দিয়ে কেউ ব্যবসা তো দূরের কথা, নীলক্ষেতে এক মিনিট অবস্থান পর্যন্ত করতে পারে না। তবে মেডিক্যালের বই একদিকে যেমন দুষ্প্রাপ্য, অন্যদিকে দাম বেশি হওয়ায় এ ধরনের বই ছাপিয়ে অনেকে কোটিপতি হয়েছে। ’

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নীলক্ষেতে রাফিন প্লাজার গলিতে মৌলি প্রকাশনীর মালিক মজিবর রহমান ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় বিবিএ, এমবিএ, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বই নকল ও পাইরেসি করে থাকেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় ৪০০ বই নকল করে বাজারে ছাড়ছেন। সোনিয়া লাইব্রেরির মালিক সেলিম রেখা মেডিক্যালের বই নকল করে বিক্রি করেন। একই রকম বই নকল করছেন ক্যাপিটাল লাইব্রেরির মালিক আয়নাল। ওঁদের ১২ জনের একটি সিন্ডিকেট এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। মেডিক্যালের বইয়ে লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই এদিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই নকল-পাইরেসিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা বিপ্লব সরকারের ভাই জনি সরকার।

নীলক্ষেত বইয়ের মার্কেট সূত্রে জানা যায়, ইকবালের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের সিন্ডিকেট আইন প্রকাশনীর অধীনে আইনের সব বইপুস্তক নকল করে বাজারজাত করছে। সংবিধানসহ সরকারি গেজেট একচ্ছত্রভাবে নকল বা পাইরেসি করছে ইউসুফ প্রকাশনী ও ব্রাদার্স প্রকাশনী।

বোর্ডের বই নকল করে ছাপার জন্য নীলক্ষেতে সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে। এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বিপ্লব সরকার ও জনি সরকার। ওঁদের সঙ্গে রয়েছেন আমান, মিন্টু, রনি, কামরুজ্জামান, বাবু, সজল প্রমুখ। ওঁরা সবাই বাবুপুরা নীলক্ষেত ইউনিট আওয়ামী লীগের নেতা। এর মধ্যে বিপ্লব সরকার ১৮ নম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

নীলক্ষেতের একাধিক ব্যবসায়ী দাবি করেন, তাঁরা বাধ্য হয়ে এ ধরনের জঘন্য ব্যবসা করছেন। কারণ ক্ষমতাসীন দলের পাতিনেতারা এতটাই প্রভাবশালী যে তাঁদের মোটা অঙ্কের চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করা যায় না। আর এসব পাতিনেতার নেতা হলেন বিপ্লব সরকার ও তাঁর ভাই চান সরকার। ওঁদের সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন মহল জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে ওঁদের গাঁটছড়া রয়েছে। নির্দেশ মেনে চাঁদা না দিলে এসব নেতা-পাতিনেতা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করেন।

তবে বিপ্লব সরকারের সুর ভিন্ন। চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই চান সরকার পুরনো বইয়ের ব্যবসা করে। সেই সূত্রে অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শুধু নীলক্ষেতই নয়, ঢাকার বাংলাবাজার, নিউ মার্কেটসহ আরো অনেক এলাকায় নামিদামি ব্যক্তিদের বই ও সরকারি গেজেট নকল হচ্ছে। আমি এসব কাজ সমর্থন করি না। যারা এ অন্যায় কাজ করছে ওদের বিরুদ্ধে আপনারা লেখালেখি করেন। প্রয়োজনে আমি সহযোগিতা করব। ’ স্থানীয় থানা সূত্রে জানা যায়, দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ বইপুস্তক নকল কিংবা পাইরেসির সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবার নাম-ঠিকানা পুলিশের জানা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কথায় কথায় এমপি-মন্ত্রীদের নাম জপে। এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

বর্ষীয়ান আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার জানান, সরকারি নথিপত্র, গেজেট কিংবা কারো লেখা বইপুস্তক যা-ই হোক না কেন, সেটা অন্য কেউ ছাপলে অনুমতি লাগবে। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে লেখককে রয়ালটি দিতে হবে। এর অন্যথা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আদালত জেল কিংবা অর্থদণ্ড দিতে পারবেন।


মন্তব্য