kalerkantho


বেসামরিক বিমান চলাচল আইনের খসড়া উঠতে পারে মন্ত্রিসভায়

মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ হয়েছে

আশরাফুল হক রাজীব   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভেটিং (আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত) থেকে ফিরে আসার পর আরো কঠোর করা হলো বেসামরিক বিমান চলাচল আইনের খসড়া। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়াটিতে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার সময় এতে এমন সাজার বিধান ছিল না।

আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিংয়েও সেটি পাঠানো হয়েছিল সেভাবে। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার পর খসড়ায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ করা হলো। পরিবর্তিত এ খসড়াটি মন্ত্রিসভা বৈঠকের এজেন্ডায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আজ সোমবার সচিবালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

আইনটির খসড়া গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। তার এক মাসের মধ্যেই দেওয়া হয় চূড়ান্ত অনুমোদন। এরপর ভেটিংও শেষ  করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। গত ২৭ নভেম্বর হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে তাঁকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়।

এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তিনটি তদন্ত কমিটি হয়। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে সাতজনকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

এ ঘটনার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বেসামরিক বিমান চলাচল আইনের খসড়ায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ হয়। পাশাপাশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কারো ইচ্ছাকৃত কাজের জন্য বিমান চালনায় অসুবিধা সৃষ্টি হলে এবং কারো জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়লে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং অনধিক পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড।

ভেটিং করার পর আরো একটি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। সার্টিফিকেট, লাইসেন্স বা পারমিটের কোনো শর্ত কেউ লঙ্ঘন করলে তাঁর পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

ভেটিং থেকে ফিরে আসার পর কেন খসড়ায় শাস্তি বাড়ানো হচ্ছে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমান চলাচলে বাধার সৃষ্টি করা হলে বড় শাস্তি পেতে হয়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) অনুমোদিত। আইকাও এর সদস্য দেশ হিসেবে বিধানটি আমাদেরও মানতে হবে। তবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর আমাদের চিন্তায় এসেছে। এ কারণে আমরা ভেটিং হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছি। এ বিধান যোগ করার পর আবার ভেটিং করা হয়েছে। তাতে আইন মন্ত্রণালয় কোনো আপত্তি করেনি। ’

গত ২৭ নভেম্বর তুর্কমেনিস্তানে বিমানের জরুরি অবতরণের ঘটনায় যে মামলা হয়েছে সেটি এই আইনে পরিচালিত হবে কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে বিষয়টি ধরিয়ে দেওয়া। আইনটি ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হবে কি না তা নির্ভর করছে মন্ত্রিসভা বা সংসদের ওপর। ওখানে যেভাবে খসড়াটি পাস হবে সেভাবেই কার্যকর হবে। ’

খসড়া আইনটিতে আরো যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিমানে চড়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমানায় প্রবেশ করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের, সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান। বর্তমানে বাংলাদেশের আকাশসীমায় অবৈধভাবে ঢুকে পড়লে শাস্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া বিমানের নেভিগেশনের সঠিক আলোক বা সংকেত কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

আইনটি পাস হলে বাংলাদেশ বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণ হবে। বর্তমান অধ্যাদেশটি ১৯৬০ সালের। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে বিমান চলাচলে নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করতে এ আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বেসামরিক বিমান চলাচল আইনে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্লাইটে নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান, বিমান দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান, বেসামরিক বিমান হিসেবে রাষ্ট্রীয় বিমানের ব্যবহার, বেসামরিক বিমান চলাচল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য বেআইনি আচরণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়গুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ইন্সপেক্টর যাতে বাংলাদেশের যেকোনো এয়ারলাইনস, অপারেটর, অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণসহ বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এয়ারলাইনসের কার্যক্রম পরিদর্শন করতে পারেন সে জন্য তাঁর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা প্রদানসংক্রান্ত নতুন ধারা এতে সংযোজন করা হয়েছে।

আজকের বৈঠকে ‘বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৭’ ও ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন আইন, ২০১৭’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া ‘খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৭’ ও ‘বস্ত্রনীতি-২০১৭’ও রয়েছে আজকের এজেন্ডায়। একই সঙ্গে বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তিনটি অবহিতকরণের বিষয়ও আছে।


মন্তব্য