kalerkantho


বসন্তের হাতছানিতে দুরন্ত শৈশব

নওশাদ জামিল   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বসন্তের হাতছানিতে দুরন্ত শৈশব

ছুটির দিন ছিল কাল, মেলার দুয়ার খুলেছিল সকালে। যথারীতি সকালে ছিল ‘শিশুপ্রহর’।

আর দুপুর থেকে ছিল নানা বয়সী মানুষের সম্মিলন। ভিড় ছিল অনেক, তবে শুক্রবারের মতো উপচানো ভিড় নয়। উৎসবের আমেজ ছিল কাল।

ছুটির দিনের শুরুতেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলাপ্রাঙ্গণকে রঙিন করে তুলেছিল শিশুরা। গতকাল ছিল বইমেলার দ্বিতীয় শনিবার আর চতুর্থ শিশুপ্রহর। শিশুরা পছন্দের বই কিনেছে, ছোটাছুটি করেছে বসন্তকে আমন্ত্রণ জানানো রোদ-বাতাসে।

কাল তাদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে বেগ পেতে হয়েছে মা-বাবাদের। সকালের শিশুপ্রহর বিকেলেও ফুরোতে চায়নি। কাল মেলায় এসেছিলেন তাদের প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

ঘরে ফিরতে দেরি করার এটিও বড় এক উপলক্ষ।

বিকেল ৩টার পর আসতে শুরু করে বড়রা। যত সময় গড়িয়েছে, ভিড় তত বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি স্টলের সামনে ছিল কৌতূহলী পাঠকের সমাবেশ। ১১তম দিনে প্রায় সব প্যাভিলিয়নেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। বসন্তের আগমনী রঙে মন রাঙিয়ে নতুন বইয়ের সোঁদা গন্ধ নিতে এসেছিল তারা। যাচাই-বাছাই করে বই কিনেছে। পছন্দের লেখকের নতুন বই কিনতে স্টলে স্টলে ঘুরেছে। বিক্রেতা-প্রকাশকদের মুখ ছিল হাস্যোজ্জ্বল। বইয়ের জন্য লম্বা লাইন, ছোটাছুটি দেখে তারা প্রাণিত হয়ে ওঠে।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশনসের প্রধান নির্বাহী কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি বাড়ছে। পাঠকরা মেলায় আসছে, দেখছে এবং কিনছে। বসন্তের শুরুর দিনে বিপুল পাঠকের সমাবেশ প্রতিবারই হয়ে থাকে। এবারও সে ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। ’

গতকাল বিকেলে মেলা পরিদর্শনে যান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে বেশ কিছু বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। এসবের মধ্যে উৎস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত সাহাদাত পারভেজের ‘গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ বইটি ছিল।

মেলা ঘুরে দেখে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ মেলায় বজায় রাখতে চাই। পাঠকরা যাতে নির্বিঘ্নে মেলায় ঘুরতে পারে, বই সংগ্রহ করতে পারে, ক্লান্ত হলে একটু বসে বিশ্রাম নিতে পারে—এই দিকগুলো নিশ্চিত করেছি। ’

সন্ধ্যায় মেলায় যান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এবার চারুলিপি প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে তাঁর বই ‘রুখে দাঁড়াবার সময়’। মেলার পরিবেশ নিয়ে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

বইমেলা উপলক্ষে প্রতিদিনই প্রকাশিত হয় বিভিন্ন ধরনের বই। নির্বাচিত চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

ভৌতিক : লেখক ইমদাদুল হক মিলন। তাঁর উপন্যাস ‘নূরজাহান’ তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। উপন্যাসের জন্য তিনি বিখ্যাত, গল্পকার হিসেবেও তাঁর ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। এ বইটি ছোটদের জন্য, গল্পের বই। আধিভৌতিক নানা বিষয় নিয়ে পাঁচটি বড় গল্প রয়েছে এতে। প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলেকিশনস। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৩২৫ টাকা।

জলগদ্য : প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিকথার বই। লেখক হরিশংকর জলদাস। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিষ্ঠাবান রূপকার হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তিনি। কথাসাহিত্যই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। লিখেছেন নানা গদ্য। বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সব্যসাচী হাজরা। দাম ২৫০ টাকা।

ইলিয়াসের সুন্দরবন এবং অন্যান্য : লেখক শাহাদুজ্জামান। কথাসাহিত্যের পাশাপাশি প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ নানা মাধ্যমে কাজ করছেন অনেক দিন ধরে। এ বইটি প্রবন্ধের। তাতে উঠে এসেছে সাহিত্য ও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ। রয়েছে লেখকের কয়েকটি সাক্ষাত্কার, যাতে তিনি সবিস্তারে বলেছেন তাঁর ভাবনা-জগৎ নিয়ে। প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। দাম ২০০ টাকা।

দূর দ্রাঘিমায় : লেখক গুলতেকিন খান। বইটি মূলত অনূদিত কবিতার, তাতে তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তের ২৫ জন কবির কবিতা। তাঁর অনুবাদের ভাষা খুবই প্রাঞ্জল। কবিতাগুলো পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে, মুগ্ধ করবে। প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৬০ টাকা।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা গেছে, গতকাল মেলার ১১তম দিনে নতুন ২০১টি বই এসেছে। এসবের মধ্যে গল্পের ২৫টি, উপন্যাসের ৩৩টি, প্রবন্ধের ১৩টি, কবিতার ৫৬টি, গবেষণার চারটি, ছড়ার পাঁচটি, শিশুসাহিত্য আটটি, জীবনী একটি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছয়টি, নাটকের দুটি, বিজ্ঞানের তিনটি, ভ্রমণবিষয়ক সাতটি, ইতিহাসের পাঁচটি, রাজনীতির একটি, কম্পিউটার বিষয়ক একটি, ধর্মবিষয়ক একটি, অনুবাদের চারটি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী একটি এবং অন্যান্য বিষয়ের ২৫টি। মেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে ৬২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয় গতকাল।

কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের চারটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘অগ্নিকন্যা’ প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রেমের উপন্যাস ‘রূপবতী’। অনন্যা প্রকাশ করেছে কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে’ ও রম্য রচনার বই ‘কিছু হাসি কিছু রম্য’।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘কিশোর উপন্যাস সমগ্র ২’। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স এনেছে লেখক ও প্রাবন্ধিক জয়নাল হোসেনের ‘মানুষ যাঁদের অনুসারী তাঁদের শৈশব ও কৈশোর’। অনন্যা এনেছে কবি হোসনে আরা জাহানের কবিতার বই ‘নিশিন্দাপাতার ঘ্রাণ’। শ্রাবণ এনেছে তরুণ কবি মফিজুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘বিমূর্ত শিলালিপি’। সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ‘আমার কথা’ মেলায় এনেছে পুঁথিনিলয়।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আবদুল গফুর হালী : জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাসির উদ্দিন হায়দার। আলোচনায় অংশ নেন রাহমান নাসির উদ্দিন ও সাইমন জাকারিয়া। সভাপতিত্ব করেন শামসুল হোসাইন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন কল্যাণী ঘোষ, কান্তা নন্দী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস ও সাজেদুল ইসলাম ফাতেমী।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ রবিবার বিকেলে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘দীনেশচন্দ্র সেনের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। আলোচনা করবেন ড. মাহবুবুল হক ও ড. এম আবদুল আলীম। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য