kalerkantho

লেখকের সেরা বই

রেস্তোরাঁ রহস্য

মোস্তফা মামুন

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রেস্তোরাঁ রহস্য

তনু কাকা এবার একটু ভারী হয়েছেন। ১০ বছরে এটুকু তাঁর অর্জন।

আবার বর্জনও আছে। ভারী হতে গিয়ে বেচারার দৈর্ঘ্য একটু কমে গেছে।

একটু ধাঁধার মতো লাগছে তো? তা গোয়েন্দার বর্ণনায় একটু ধাঁধা থাকতেই পারে। তবে এ ধরনের গল্পের ধারা অনুযায়ী রহস্যটা শেষ পর্যন্ত জমিয়ে না রেখে শুরুতেই ভেঙে দিই। আসলে এ বছর সিরিজের দশম কাহিনিতে এসে আমার গোয়েন্দা তনু কাকা সিরিজের আকারে-ধরনে বদল এসেছে। আগে বইটি ছিল পেপারব্যাক, এবার হয়েছে হার্ড বাইন্ডিং। তাই পুরুত্ব একটু বেড়ে বইটা আগের চেয়ে দেখতে ভারী হয়েছে। হার্ড বাইন্ডিংয়ে আর দশটা বইয়ের মতো হয়ে যায়, গোয়েন্দা গল্প বা সিরিজ হিসেবে আকারেও তো

একটু বিশেষত্ব থাকা দরকার—মনে হলো পার্ল পাবলিকেশনেসর স্বত্বাধিকারী হাসান জায়েদীর। তাই দৈর্ঘ্যের দিক থেকে একটু ছোট করে প্রস্থে বাড়ানো হয়েছে।

আর এভাবেই ১০ বছর যাওয়ার পর তনু কাকা আসলে লম্বা হওয়ার বদলে একটু ছোট হয়ে গেছেন। তনু কাকার মতো তুখোড় গোয়েন্দা বাস্তবে থাকলে এই অর্জন-বর্জন মেনে নিতে রাজি হতেন কি না জানি না; কিন্তু পাঠক প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। পড়ার জন্য, ধরার জন্য, দেখার জন্য এই আকারটাই নাকি সুবিধাজনক। তা ছাড়া গোয়েন্দা ভারী হলেই তো বেশি মানায়। আর একটু খাটোও থাকা বোধ হয় ঠিক। এটা তো প্রচলিত বিশ্বাস যে লম্বার চেয়ে খাটো মানুষেরাই বেশি বুদ্ধিমান হয়।

যা বলছিলাম, ১০ বছর আগে বইমেলার ঠিক আগে একদিন সাংবাদিক বন্ধু রাজীব নূরের ফোন। জরুরি তলব। দেখা করতে হবে। পান্থপথের অফিসে দেখা করতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে স্তম্ভিত। প্রথম চমক, পেশাদার সাংবাদিক রাজীব নূর পাশাপাশি প্রকাশনা ব্যবসায় নামছেন। এর চেয়েও বড় চমক তাঁর এই দাবি—আমাকে গোয়েন্দা কাহিনি লিখতে হবে। গোয়েন্দা গল্পের খুব সমঝদার ছিলাম না কখনো, তাই নিজের ওপর বিশ্বাসই তৈরি হয় না। তত দিনে অনেকগুলো বই বেরিয়ে গেছে, কিশোর উপন্যাসের লেখক অল্প কিছু মানুষের মনোযোগও পেয়েছি। তাদেরই একজন রাজীব নূর, যিনি এই লেখাগুলোর ভিত্তিতেই আমার মধ্যে গোয়েন্দা সিরিজ লেখক হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। তিনি পেলেও আমি পেলাম না। তবু যে চাপে ঢোঁক গিললাম, তারও কারণ রাজীব নূরের আন্তরিকতা। তিনি আমাকে প্রস্তুত করার জন্য বেশ কিছু মোটা মোটা বিদেশি গোয়েন্দা সাহিত্যও কিনে এনেছেন, যেগুলোর ছোঁয়ায় আমি আমার সুপ্ত ও অচেনা ক্ষমতাটাকে জাগিয়ে তুলতে পারি! একজন প্রকাশক এতটা আন্তরিক, তখন লেখকেরও পাল্টা দায়িত্ব তৈরি হয়। তবু শেষ একটা আশা ছিল, বইমেলার ঠিক আগে প্রকাশকদের এ রকম নানা উত্তেজনা তৈরি হয়। সেগুলো সাধারণত দুই-তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। রাজীব ভাইয়ের ক্ষেত্রে হলো। টানা চাপে শেষে এক রাতে বসে গেলাম। জন্ম হয়ে গেল তনু কাকার। সঙ্গী হিসেবে এলো শান্ত, কিশোরদের জন্য লেখা বলে তার জবানিতে উত্তমপুরুষেই কাহিনিটা লেখার সিদ্ধান্ত। আর নিরাপদ থাকতে প্রথম গল্প হিসেবে বেছে নিলাম নিজের চেনা ক্রিকেটের জগৎ। কয়েক বছর আগে কেনিয়া সফরে গিয়ে সেই দেশটাকে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তাই কেনিয়া আর ক্রিকেট মিলেই প্রথম কাহিনি। ওখানে সফরে গিয়ে বাংলাদেশি একজন ক্রিকেটার খুন হয়। সেটার তদন্তে তনু কাকা চললেন নাইরোবি। সেই চলা গত ১০ বছর ধরে চলছে। মাঝে সিলেট, কুমিল্লা ও রাজশাহীতে অভিযান চালালেও বাকি সব গল্পই বিদেশের পটভূমিতে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, ত্রিনিদাদ কিংবা ভারতের চণ্ডিগড়-সিমলা। গোয়েন্দা সিরিজ হলেও নিজের অল্পবিস্তর ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, কিশোরদের বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে সিরিজটাকে। আলাদা করে ভ্রমণ কাহিনি লেখার বদলে তনু কাকা, শান্ত, পরী কিংবা সাব্বির মামাকে ওই সব দেশে নিয়ে গিয়ে তাঁদের চোখে সেই দেশটাকে পরিচিত করালে সেটাই বরং আকর্ষণীয় হবে বেশি। আর এভাবেই তনু কাকা ঘুরছেন পৃথিবী। ঘুরে ঘুরে এবারের ‘রেস্তোরাঁ রহস্য’ কাহিনিটা তৈরি হয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়েতে।

বাংলাদেশের খুব বেশি মানুষ সেখানে যায় না। তাই নরওয়ে গিয়েই মনে হয়েছিল ওখানে তনু কাকাকে নিয়ে যেতে হবে একবার। এমনিতে নরওয়ে সম্পর্কে আমাদের ধারণা হলো খুবই ঠাণ্ডা দেশ, সারাক্ষণ বরফ পড়ে। আর ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলেও একটা পরিচিতি আছে সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ এই জ্ঞানের বাইরে আরো কিছু জ্ঞান হলো। শীত, বরফ, খেয়ালি সূর্য—এসব ঠিক আছে; কিন্তু এর বাইরে নরওয়ে হলো দারুণ তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ। আমাদের মতো সেখানেও মাছের খুব কদর। এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষে যুদ্ধশিশুদের ওরা বরণ করে নিয়েছিল বলে সেই সূত্রেও একটা যোগাযোগ আছে। এই যুদ্ধশিশু, তেলের ব্যবসা—এসব নিয়েই তৈরি হলো তনু কাকার অভিযানের রাস্তা। অসলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে কিডন্যাপ হয়ে যান তনু কাকা। এক দিন পর সেই মানিব্যাগটা ফেরত দিতে নিজেই আসে কিডন্যাপকারী, দাবি করে যে এই রেস্তোরাঁয় ড্রাগ ব্যবসা চলে বলে হাতেনাতে ধরতে সে তদন্তে নেমেছে। তনু কাকাকেও ড্রাগচক্রের একজন মনে করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এদিকে রেস্তোরাঁর মালিকের দাবি, একটা বড় কম্পানি ওর রেস্তোরাঁটা কিনতে চায়। ড্রাগ ব্যবসার বদনাম দিয়ে দাম কমানোই ওদের উদ্দেশ্য। গল্পে চলে আসে একজন যুদ্ধশিশু, যে কাকা আর তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে আবেগ। কিন্তু একটু পরে দেখা যায় তার পরিচয়টা মিথ্যা। তাহলে কলকাঠি নাড়ছে কে? অসলোর প্রভাবশালী পাকিস্তানি অভিবাসী সম্প্রদায় নাকি ইউরোপের ড্রাগ সম্রাটরা নাকি আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসার মারপ্যাঁচ নাকি একেবারেই সন্দেহের বাইরে থাকা অন্য কেউ! এসবেরই জবাব রেস্তোরাঁ রহস্যে। সঙ্গে নরওয়ের শীতমাখা সৌন্দর্য, জীবনব্যবস্থায় শুদ্ধতার ছবি মিলিয়ে এটা একাধারে গোয়েন্দা উপন্যাস এবং নরওয়ে ভ্রমণ কাহিনি।

দশম কাহিনিতে এসে অনেক কিছু বদলেছে। আকারে-আঙ্গিকে পরিবর্তন এসেছে। প্রকাশকও পাল্টেছে। পাঠসূত্রের বদলে এবার থেকে পার্ল পাবলিকেশনেস। কিন্তু বদলায়নি একটা জিনিস। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ। প্রথম গল্পটা পড়ে তনু কাকার যে ছবিটা তিনি তৈরি করেছেন সেটা আমার কল্পনার তনু কাকার চেয়েও অনেক আকর্ষণীয়। সেই ছবি এবং সূত্রে আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ এবারও আছে। শুধু ছোট্ট একটা সমস্যা। হার্ড বাইন্ডিংয়ে রূপান্তর এবং আকার পুরু হওয়ার কারণে দামটা একটু বেড়ে গেছে। অন্যের বই হলে চোখ বন্ধ করে বলে দিতাম, ‘ভালো জিনিসের দাম তো একটু বেশিই হবে!’

নিজের বইয়ের বেলায় তো আর সেটা বলা যায় না। লেখার কাজটুকু আমার। বলারটা আপনাদের।


মন্তব্য