kalerkantho


লাইটার জাহাজ শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



লাইটার জাহাজ শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে নৌপথে পণ্য পরিবহন বন্ধের হুমকি দিয়েছে লাইটার জাহাজ শ্রমিকরা। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ২০১৬ সালে জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের তিন দফা ধর্মঘটে নৌপথে পণ্য পরিবহন অচল হয়ে পড়েছিল। পণ্য নামাতে না পেরে মাসের পর মাস জাহাজ বহির্নোঙরে অলস বসে মাসুল গুনছিল। সেই ধকল সামলে না উঠতেই আবারও ধর্মঘটের হুমকিতে উদ্বিগ্ন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

লাইটার জাহাজ শ্রমিকদের দাবি পূরণ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও প্রতিবারই বিপাকে পড়তে হয় বন্দরকে। সুনাম ক্ষুণ্ন হয় বন্দরের।

এ বিষয়ে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল, চিটাগাং কসমোপলিটনের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছোট জাহাজ সংকট ও আগের ধর্মঘটের ধকল সামলে ওঠার আগেই আবারও ধর্মঘট চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করবে। ’ সব ধরনের ধর্মঘট থেকে চট্টগ্রাম বন্দরকে মুক্ত রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পণ্য আমদানি-রপ্তানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর কোথাও সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই পুরো প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। সুতরাং ধর্মঘট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ধর্মঘটের আর্থিক ক্ষতির বোঝা প্রথমে আমদানিকারকরা নিলেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু ভোক্তারাই এর দায় বহন করে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচলরত ৮০০ জাহাজ মালিকের দেড় হাজার লাইটার বা ছোট জাহাজ রয়েছে। এ ছাড়া ভারত রুটে চলাচল করে ৪০০ জাহাজ, মোংলা বন্দরের আশপাশে চলাচল করে ৪৫০টি জাহাজ। এর মধ্যে কত শতাংশ মালিক নতুন হারে বেতন-ভাতা দিয়েছেন এর সঠিক কোনো হিসাব নেই। যদিও আন্দোলনকারী শ্রমিক সংগঠন বলছে, মাত্র ২৮ থেকে ৩০ জন মালিক নতুন বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন। সেগুলো ধর্মঘটের আওতার বাইরে থাকবে।

এ বিষয়ে ধর্মঘট আহ্বানকারী লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়ন একাংশের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব জাহাজ মালিক গেজেট মতে নতুন কাঠামোতে বেতন-ভাতা কার্যকর করেছেন তাঁদের জাহাজে ‘সাদা ফ্ল্যাগ’ উঁচিয়ে পণ্য পরিবহন করা যাবে, কোনো বাধা ছাড়াই।

যদি সেসব জাহাজে হামলা হয় তাহলে দায়িত্ব কি আপনারা নেবেন—জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এ রকম হবে না। কারণ সবাইকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি। জাহাজে কর্মরত স্টাফরা নিজ উদ্যোগে সেটি প্রদর্শন করবেন। ’

এদিকে জাহাজ মালিকরা চাইছেন, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি জাহাজ মালিক সমিতির নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব আসার পর বিষয়টি কার্যকর করতে। কিন্তু তত দিন পর্যন্ত সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করেই আন্দোলনের ডাক দিল শ্রমিক সংগঠনটি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাইদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকাশিত গেজেটে শ্রমিকদের শ্রেণিভেদে সমন্বিত বেতন-ভাতায় কিছু জটিলতা আছে। সেসব বিষয় সমাধানে আমরা শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে বসেছি। শ্রমিকদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করব। আশা করছি শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়ার আগেই এর সমাধান করতে পারব। ’

সাইদ আহমেদ বলেন, ‘১৭ ফেব্রুয়ারি জাহাজ মালিকদের নির্বাচন ঘিরে দুটি পক্ষ পৃথকভাবে লড়ছে। নির্বাচনের আগে আমি এককভাবে চাইলেও বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সে জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। ’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাট এবং বিভিন্ন জেটি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বছরে চার কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। এর বড় অংশ নিজস্ব জাহাজের মাধ্যমে শিল্প-কারখানার মালিকরা পরিবহন করে থাকেন। আর দেড় কোটি টন পণ্য ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে জাহাজ বুকিং দিয়ে পরিবহন করা হয়। ধর্মঘট কার্যকর হলে পণ্য পরিবহনে সবগুলো জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি জাহাজ বাড়তি সময় বসে থাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার গুনতে হয়। জাহাজ বসে থাকা ছাড়াও কারখানার উৎপাদন ব্যাঘাত করার আর্থিক ক্ষতি অনেক বেশি। এই বাড়তি ভাড়া পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ হয়ে দাম বেড়ে যায়। ’

জানা গেছে, ২০ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা ধর্মঘট ডাকে লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়ন। আট দিন টানা ধর্মঘটের পর শ্রমিকরা সমঝোতায় এলে বেঁকে বসেন জাহাজ মালিকরা। এরপর তাঁরাও ২৮ এপ্রিল থেকে ধর্মঘট শুরু করে অব্যাহত রাখেন ২ মে পর্যন্ত। এরপর হঠাৎ জেগে ওঠা সংগঠন নৌযান শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ২২ আগস্ট আবারও ধর্মঘট ডাকে নৌযান শ্রমিকরা। তিন দফায় অন্তত ১৭ দিন ধর্মঘটে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে যায়। ছোট জাহাজ সংকটের কারণে পাঁচ দিনে একটি জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তর করতে পারলেও সেই সময় লেগে যায় এক থেকে দেড় মাস। এর সঙ্গে যোগ হয় পণ্য পরিবহন ধর্মঘট। দুয়ে মিলে অচলাবস্থা তৈরি হয়। অনেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ছেড়ে মোংলা বন্দরে গিয়ে পণ্য স্থানান্তর কাজ শুরু করে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক মাস ধরে বন্দরে জাহাজজট অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। কনটেইনার জাহাজগুলো এক দিন পরই জেটিতে ভেড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর সাধারণ পণ্যের জাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও অপেক্ষমাণ সময় কমে এসেছে। এ অবস্থায় নতুন করে নৌ ধর্মঘটের হুমকি পণ্য আমদানিতে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে।


মন্তব্য