kalerkantho


সবচেয়ে সুন্দর করুণ

আহমাদ মোস্তফা কামাল

অন্যান্য   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সবচেয়ে সুন্দর করুণ

এবারের বইমেলায় আমার চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে সেটি সম্পর্কে লেখার অনুরোধ পেয়েছি কালের কণ্ঠ’র সম্পাদনা বিভাগ থেকে।

একে তো নিজের লেখা নিয়ে কিছু বলতে সংকোচ আর অস্বস্তিবোধ হয়, তার ওপর আছে এই বেছে নেওয়ার সংকট। এই চারটি বইয়ের অন্তত তিনটি আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর অপেক্ষার ফল; কী করে একটিকে বেছে নিই? অন্যগুলো মন খারাপ করবে না? তবু লিখতে হলে বেছে যেহেতু নিতেই হবে, তার আগে অন্তত সবগুলোর নাম-পরিচয় উল্লেখ করা যাক। প্রথমটি উপন্যাস : ‘সবচেয়ে সুন্দর করুণ’। প্রকাশিত হয়েছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে। এটি নিয়ে লিখব আজকে। দ্বিতীয়টি প্রবন্ধ : ‘বাংলা গল্পের উত্তরাধিকার’, প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী। বাংলাদেশের ছোটগল্প নিয়ে প্রায় পনেরো বছর ধরে যেসব প্রবন্ধ লিখেছিলাম আমি, সেগুলো সংকলিত হয়েছে এই গ্রন্থে। তৃতীয়টি সাক্ষাত্কারগ্রন্থ : ‘তাঁহাদের সঙ্গে কথোপকথন’, এটির প্রকাশকও রোদেলা। শামসুর রাহমান থেকে শহীদুল জহির, এগারোজন লেখকের সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতার সংকলন এটি। পনেরো বছর ধরে এসব সাক্ষাত্কার নিয়েছি, দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল, এবার একসঙ্গে গ্রন্থিত হলো। ফলে এসব বইয়ের জন্য আমার মনে এক ধরনের কোমল ভালোবাসা রয়েছে। চতুর্থটি নভলেট : ‘প্রেম অথবা দহনের গল্প’। এটি অবশ্য এক সম্পাদক বন্ধুর অনুরোধে ঈদ সংখ্যার জন্য লিখেছিলাম, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে।

‘সবচেয়ে সুন্দর করুণ’ উপন্যাসটির কথা বলি। আগেই বলেছি, নিজের লেখা সম্পর্কে বলতে ভারি অস্বস্তি লাগে। মনে হয়, যা বলার তা তো উপন্যাসেই বলেছি, নতুন করে আর কী বলব? বরং নেপথ্যের গল্প কিছুটা বলা যাক। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমন এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের আরো অনেক শহীদের মতোই তার বাবার নামটিও ইতিহাসের বইয়ে লেখা হয়নি। তাঁর কবরটি কোথায় সুমন জানে না। এমনকি তিনি আদৌ কবর পেয়েছিলেন কি না, নাকি আরো লাখো শহীদের মতো তাঁকেও ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীর জলে, অথবা গণকবরে ঠাঁই হয়েছিল, সুমন তা-ও জানে না। তার ছোটবেলা কেটেছে নিদারুণ অবহেলা, দারিদ্র্য আর গ্লানির ভেতর দিয়ে। বাবার মৃত্যু তার মাকে উপহার দিয়েছিল অকাল বৈধব্য। এই তরুণী শহীদ জায়াকে নিয়ে গ্রামের মানুষ কম কটু কথা বলেনি। সেসব শুনে শুনেই বেড়ে উঠেছে সুমন। সে যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, তার মা যে শহীদ জায়া এবং এই পরিচয়গুলো যে বিশেষ ব্যাপার, তা কখনো অনুভবই করতে পারেনি। পারবে কিভাবে? তখন যে সামরিক শাসকদের স্বেচ্ছাচারিতার কাল, তখন যে মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করার কাল! মা-বাবা বা তার নিজের মর্যাদার বিষয়টি সে প্রথম বুঝতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে, যখন বন্ধুরা পরিচয় পেয়ে তাকে গভীর ভালোবাসার বন্ধনে জড়ায়, মাকে দেয় বিশেষ সম্মান। আর তখন থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। উপন্যাসটি সেই সময়কে ছুঁয়ে এই সময় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, অন্যদিকে চলছে মুক্তবুদ্ধির মানুষদের ওপর আঘাতের পর আঘাত। বলা বাহুল্য, সুমন কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও তার পাশে পাশে এসেছে আরো অনেক চরিত্র, আরো অনেক ঘটনা। উপন্যাস তো কেবল বাস্তব ঘটনা আর চরিত্রের ওপর দাঁড়ায় না, বরং কল্পনার অবাধ রং মিশেই সেটি শিল্প হয়ে ওঠে। আমিও চেষ্টা করেছি সেই রং মেশাতে। পাঠকের কাছে এই বাস্তব কল্পনার জগিট যদি সত্যি মনে হয়, তাহলেই হয়তো বলা যাবে—আমি আমার কথাগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি।


মন্তব্য