kalerkantho


শেষ কর্মদিবসে বিদায়ী সিইসি

অত্যন্ত নিরপেক্ষ চাপহীন দায়িত্ব পালন করেছি

৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা ছাড়া বিকল্প ছিল না

বিশেষ প্রতিনিধি   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘আত্মমূল্যায়ন ঠিক নয়। এটা এক্সটার্নাল হওয়া উচিত।

ইতিহাস এক দিনে লেখা হয় না। অনেক দিনে লেখা হয়। সেখানে পর্যালোচনা সঠিক হবে। ’ ইতিহাসে নিজেদের মূল্যায়ন সম্পর্কিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তিনি দাবি করেছেন, দায়িত্ব পালনকালে কোনো ফোনকল পাননি। অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন বিজয়ী হওয়ার বিরল ঘটনা সম্পর্কে কাজী  রকিব বলেছেন, ‘ইটস অ্যা পলিটিক্যাল গেইম। পলিটিকসে আপনি যদি নির্বাচনের মাঠে না নামেন তাহলে অন্য লোক তো ফাঁকা মাঠে গোল করে চলে যাবেই। এটা অন্য জিনিস।

গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটায় নির্বাচন কমিশন ভবনে শেষ দিন অফিস করে চার নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ,  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী ও মো. শাহ নেওয়াজকে নিয়ে হাসিমুখে ভবনের মিডিয়া সেন্টারে শেষ বক্তব্য দেন সিইসি কাজী রকিব। ইসি সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বিদায়ী বক্তব্যে সিইসি কাজী রকিব গত পাঁচ বছরে কাজ করতে গিয়ে কোনো ধরনের ভুল হলে তা মাফ করে দেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে আজ আমাদের শেষ কার্যদিবস। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমরা নির্বাচন কমিশনে ব্যস্ততম সময় পার করেছি। অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি এবং তা সফলভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। ’

কাজী রকিব বলেন, ‘আমি শপথ গ্রহণের পরই বলেছিলাম যে কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ দেব আমরা নিরপেক্ষ। ২০১৩ সালের মধ্যে ছয়টি সিটি করপোরেশনে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ করেছি। ওই নির্বাচনগুলো করতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। কিছু বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়া সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল। ওই সময়ে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা এসে আমাকে সুষ্ঠু নির্বাচন করায় অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা বলেছিলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁরা মিডিয়াতে আমাদের সম্পর্কে সমালোচনা করছেন, আমরা যেন কিছু মনে না করি। ’

বিদায়ী সিইসি বলেন, ‘সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন করা ছাড়া আর কোনো গণতান্ত্রিক পথ আমাদের জন্য খোলা ছিল না। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টায় প্রচুর জানমালের ক্ষতি হয়। এমন সহিংস পরিবেশে নির্বাচন পরিচালনা করা যে কতটা দুষ্কর তা খুব কম লোকই উপলব্ধি করতে পারবে। ওই সময়ে নির্বাচন না হলে দেশে যে কী অসাংবিধানিক ও অরাজক সংকট সৃষ্টি হতো তা আপনারা কল্পনা করতে পারেন। কমিশন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নির্বাচন করতে সক্ষম হয়। তিনজন নির্বাচন কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করেন এবং ১৩০ জন অগ্নিদগ্ধ ও আহত হন। অন্য সব নির্বাচনও বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আমরা সম্পন্ন করেছি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সাত হাজার ৪৬০টির বেশি নির্বাচন সময়মতো করতে সমর্থ হয়েছি। ’

বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু করাকে নিজেদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন কাজী রকিব। তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা ভালো করেছি তার দাবিদার আপনারা সবাই। আর যেটা খারাপ করেছি সেটার দায়দায়িত্ব আমার। ’

বর্তমান কমিশনের সময়ে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এর দায় সরকার, ইসি নাকি অন্য কারো—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন কান্ট্রি (দেশ) এবং এ দেশে মুক্ত আলোচনা হয়। অনেক উন্নত দেশের চেয়ে আমাদের দেশে গণমাধ্যম অনেক স্বাধীন। যার যার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না। ’

নির্বাচনে দলীয় চাপ প্রসঙ্গে কাজী রকিব বলেন, ‘ফ্রাঙ্কলি স্পিকিং, আমি কারও ফোনকল পাইনি। কেউ আমাকে বলেননি, এটা করো বা এটা করতে হবে। বরং কিছু উল্টো জিনিস হয়েছে। একসময় আমরা সতর্ক ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। ডিসি আমাদের রিটার্নিং অফিসার। তাঁকে আমরা কী নির্দেশ দেব? ডিসি আমাদের ফোন করে জানালেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন যে তিনি নিজ গাড়ি নিয়ে প্রচারে যাবেন এবং কোনো প্রটোকল দিতে নিষেধ করেছেন। তখন তাঁকে আর বলতে হয়নি তুমি প্রটোকল দিতে পারবে না, প্রটেকশন দিতে পারবে। আমি কোনো ফোনকল পাইনি, চাপ পাইনি। আমি অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছি। ’

শেষ তিন বছরে নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যাওয়া কমিশনের ব্যর্থতা কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রকিবউদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থা মোটেই দুর্বল অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। নির্বাচনে সহিংসতা হয়েছে, মারামারি হয়েছে। এটা সামাজিক অবক্ষয়। আমরা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করেছি। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরো উন্নত ডেমোক্রেসির প্র্যাকটিস হবে। ’

প্রসঙ্গত, সিইসি কাজী রকিবের সঙ্গে তিন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, আবু হাফিজ ও জাবেদ আলীর গতকাল ছিল শেষ কর্মদিবস। আর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ তাঁর মেয়াদ শেষ করবেন ১৪ ফেব্রুয়ারি।


মন্তব্য