kalerkantho


প্রেম ও মৃত্যুর কথন

জাহিদ হায়দার

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রেম ও মৃত্যুর কথন

তা প্রায় দুই যুগ আগের কথা। এক অপরাহ্নে আমরা কজন ‘সন্ধানী’ অফিসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সম্পাদক বেলাল চৌধুরী পিয়নকে চা আনার কথা বলে কী একটা কাজে বাইরে গেলেন। বললেন, ‘আড্ডা দিতে থাকো, শিগগিরই ফিরব। ’

সেদিন এক কুলক্ষণজাত বাচালতা আমাকে পেয়ে বসেছিল, তরুণ প্রশান্ত মৃধাকে ওই আড্ডায় বলেছিলাম, ‘একটি উপন্যাস লিখব। ’ কায়েস আহমেদ বললেন, ‘লিখতে শুরু করুন, জাহিদ। ’ অনেক পরে আমার কয়েকটি গল্প পড়ে আন্দালিব রাশদী উৎসাহ দিলেন, ‘আপনার হাতে উপন্যাস হবে। ’ কায়েস আহমেদ এখন প্রয়াত। আন্দালিব ও প্রশান্তর সঙ্গে দেখা হলে কখনো মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করেন, ‘উপন্যাস কত দূর?’ এ প্রশ্ন প্রেরণাদায়ক। মানুষ কত কিছু ভুলে যায়, এ দুই তরুণ বন্ধু আমাকে সুন্দর বিপদে ফেলে দেওয়ার কথা ভোলেন না। ওঁদের কাছে মুখ দেখানোর জন্যই ‘প্রেম ও মৃত্যুর কথন’ নামের উপন্যাস লেখার চেষ্টা।

কী বিষয় নিয়ে লেখা যেতে পারে? মূল গল্পটি কী হবে? আখ্যানের পেছনের আখ্যান কিভাবে গড়ে তোলে উপন্যাসের সৌধ? একটি বিশেষ মেসেজ না দিলে পাঠক আমার উপন্যাস পড়বে কেন? চরিত্রপ্রধান উপন্যাস হবে, নাকি বক্তব্যপ্রধান? প্রশ্নগুলোর উত্তর আমি জানি। কিন্তু ওই কাজগুলো কিভাবে উপন্যাসকার দক্ষতার সঙ্গে করেন, আমার অজানা। সমাজ, রাজনীতি ও পরিপ্রেক্ষিতের যথাযথ বিন্যাস গল্পে না থাকলে আমিই তো আমার লেখা বাতিল করে দেব।

একদিন সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলাম। যখন আমি তাঁর গান শুনি, ‘গীতবিতান’ খুলে নির্দিষ্ট গানটি পড়ি আর শুনি। কখনো কখনো গুনগুন করি। বাজছিল ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যামসমান’। হঠাৎ এক বিদ্যুচ্চমকের মতো একটি প্রশ্ন আমাকে আলোকিত করে : গভীর প্রেম কি একরকমের মৃত্যু, যা একজন প্রেমিক বা প্রেমিকাকে সীমিত বৃত্তের মধ্যে নিরন্তর ঘোরায়, অন্য দিগন্তের দিকে যেতে দেয় না? রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যামসমান’ আমাদের কি এই দর্শন বলছে? গানটা তিন-চারবার শুনলাম। এবং মনে হলো, এই মেসেজকে কেন্দ্রে রেখে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করা যেতে পারে।

‘প্রেম ও মৃত্যুর কথন’ লেখা হয়েছিল ২০০৯ সালে। অধুনালুপ্ত ‘সাপ্তাহিক ২০০০’-এ ২০১০ সালে ‘মেয়েটি ছেলেটিকে হাতে রেখেছিল’ শিরোনামে ছাপা হয়। পত্রিকার সম্পাদক তখন ছিলেন গোলাম মোর্তোজা। প্রয়াত ফজলুল আলমকে আমাদের বন্ধু আহমেদ মাজহার লেখাটি পড়তে বলেছিল। ফজলুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। পরে একদিন মাজহার পরিচয় করিয়ে দিলে তিনি বললেন, ‘জাহিদ, আপনার উপন্যাসের পাঠক এই দেশে পাবেন না। পাতলা মেজাজে প্রেমের কাহিনি লিখলে পাঠক পেতেন। ’

লেখাটি ২০১৬ পর্যন্ত পড়ে ছিল ড্রয়ারের তলায়। ঘষামাজা করে নামও বদলে দিলাম। আন্দালিব রাশদী ও জয়তীর প্রকাশক মাজেদুল হাসানকে লেখাটি পড়তে দিই। দুজনই বলল, সাধারণ পাঠকের জন্য এই উপন্যাস নয়। জয়তীর কর্ণধার বলল, ‘আমি ছাপব। ’ আমি বললাম, টাকা নষ্ট হবে। ও বলল, ‘হোক। ’

উপন্যাসের গল্পটি এ রকম : প্রধান দুটি চরিত্র রাজন ও পিয়ারী ‘মৃত্যু’ ও ‘প্রেমের কবিতা’ নামের অমোঘ সত্যের দুটি বই কিনেছিল প্রায় একই সময়ে। তাদের পরিচয়ও তখন।

পিয়ারী যখন রাজনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল, কেন সে রাজনকে কখনো বলে না, তার প্রেমিক আকবর জেল খাটছে? আকবর ও পিয়ারী রাজনীতি করে, অথচ অর্জিত আদর্শে আস্থাহীন। রাজনীতির সুবিধাবাদের নিয়তি নির্ধারিত দাসদাসী তারা।

তরুণ কবি রাজন জানে, বোঝে বিচ্ছিন্নতা, স্বার্থপরতা, হিংসা ও সুবিধাবাদিতা জীবনের অংশ। ওই সব থেকে নিরন্তর মুক্তি খোঁজা সমকালীন মানুষের বাঁচা জীবনপর্বের জরুরি কাজ। সে পিয়ারীকে দোষ দেয় না। ‘প্রেম’ ও ‘মৃত্যু’ বিষয়ক দুটি বই পাশাপাশি, রাজনের মাথার কাছে, দাঁড় করিয়ে রাখা। রাজন দুটি বইয়ের নাম পড়ে। ওই সত্যের পাশে তাকে থাকতেই হয়। বইটি প্রকাশ করেছে জয়তী, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, মূল্য ১৮০ টাকা।


মন্তব্য