kalerkantho


ঢাকার বাইরেও হোক এমন আয়োজন

নওশাদ জামিল   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকার বাইরেও হোক এমন আয়োজন

চট্টগ্রামের একটি সরকারি কলেজের গণিতের শিক্ষক সানোয়ার হোসেন। বয়স ত্রিশের কোঠায়।

চোখে ভারী চশমা। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গতকাল মঙ্গলবার তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের সামনে। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘থাকি চট্টগ্রামে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও মেলায় আসতে পারি না। পছন্দ মতো বই কিনতে পারি না। দুই দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছি মেলায় আসার জন্যই। চট্টগ্রামেও একুশের বইমেলা করা উচিত। চট্টগ্রামসহ আশপাশের নানা জেলার পাঠকরা তাতে খুব উপকৃত হবে। ’

মেলা প্রাঙ্গণে গতকাল কথা হলো সিলেট থেকে আসা পাঠক হায়দার হোসেনের সঙ্গে।

তাঁর মন্তব্য, উদ্যোগের অভাবেই দেশে আশানুরূপ পাঠক বাড়েনি। অথচ সত্যিকারের সুনাগরিক সৃষ্টিতে পাঠক তৈরির বিকল্প নেই। সেটার জন্য ঢাকার বাইরেও নিয়মিত বইমেলার আয়োজন করতে হবে।

সানোয়ার ও হায়দারের মতো অসংখ্য পাঠক দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বে অনেকে আসতে পারেন না অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। এ অবস্থায় পাঠক বৃদ্ধির জন্য, বইয়ের প্রসারের জন্য, সৃজনশীল ও মননশীল সমাজ গঠনের জন্য দেশের সব বিভাগীয় শহরেই অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজনের দাবি উঠছে কয়েক বছর ধরে। ঢাকার বাইরে বইমেলা আয়োজন প্রসঙ্গে পাঠক-ক্রেতারা বলে, একুশের চেতনা সারা দেশের। আর সেই চেতনা ছড়িয়ে দিতে, পাঠক সৃষ্টি করতে প্রাথমিকভাবে সব বিভাগীয় শহরেই অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন করা উচিত। এতে পাঠক সহজেই বই পেতে পারে।

আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই ঢাকায় বইমেলা হয়, মেলাকে কেন্দ্র করে বই উৎসব হয়, প্রচুর বই প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বছরের অন্য সময়গুলোতে বই নিয়ে এত মাতামাতি নেই। এ অবস্থায় দেশের সব বড় শহরে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন হলে দারুণ হবে। আর সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি।

ভিড় ও বিক্রি দুই-ই বাড়ছে : অমর একুশে গ্রন্থমেলার গতকাল ছিল সপ্তম দিন। দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে মেলাও তত বেশি জমে উঠছে। বাড়ছে দর্শনার্থী, বাড়ছে ক্রেতাও। এক সপ্তাহ শেষে গতকাল প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিক্রিবাট্টা বাড়ছে প্রতিদিনই। তাঁরা আশা করছেন, আগামী শুক্রবার থেকে পরিপূর্ণভাবে জমে উঠবে এবারের গ্রন্থমেলা। পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্সের কর্ণধার কামরুল হাসান শায়ক বলেন, এবার প্রথম সপ্তাহেই ভালো পাঠক-ক্রেতার সমাগম হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে বিক্রি।

প্রাইম ব্যাংকের অমর একুশে কার্ড : একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে ২১ শতাংশ ছাড়ে অমর একুশে কার্ড ছেড়েছে প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড। এক হাজার ও দুই হাজার টাকা মূল্যের এই প্রিপেইড কার্ডটি পাওয়া যাবে ব্যাংকের সব শাখায়। ২১ শতাংশ ছাড়ে এক হাজার টাকার কার্ডটি পাওয়া যাবে ৭৯০ টাকায় আর দুই হাজার টাকার কার্ডটি পাওয়া যাবে এক হাজার ৫৮০ টাকায়। মেলা চলাকালীন ১৪টি প্রকাশনীতে এই অফার চলবে।

গতকাল বিকেলে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে যৌথভাবে বিশেষ সুবিধার এই প্রিপেইড কার্ডের উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ কামাল খান চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক, সাবেক সভাপতি ওসমান গনি প্রমুখ।

মোড়ক উন্মোচন : গতকাল ৯টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে জাফর আহমেদ চৌধুরীর ‘সমকাল : একটি কবিতা একটি কাব্য’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন লেখক নিজেই। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। বইটি প্রকাশ করেছে জ্ঞান বিতরণী।

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো :

তোমাকে হারিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছি : কাব্যগ্রন্থটির লেখক কবি আল মাহমুদ। বাংলা কবিতায় এক অনিবার্য ও কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় তিনি সৃজন করেছেন অসংখ্য কালজয়ী কবিতা। বইটি প্রকাশ করেছে জয়তী। দাম ১০০ টাকা। বইটিতে আপাদমস্তক প্রেমিক কবির প্রেমসত্তা ফুটে উঠেছে নান্দনিক পঙিক্ততে। সহজ ও প্রাণবন্ত ভাষায় লেখা তাঁর কবিতাগুলো পাঠকের মনে সৃষ্টি করবে অন্য রকম ভালো লাগা।

রবীন্দ্রবিশ্বাসে মানব-অভ্যুদয় : মননশীল নিবন্ধের বই। লেখক সন্জীদা খাতুন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখকের চিন্তাচেতনা ও যাপিতজীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। বইটিতে রবীন্দ্রমানসের নানা দিক যেমন বিশ্লেষণ করা হয়েছে তেমনি উঠে এসেছে বিশ্বকবির চিন্তাধারার রূপমাধুরী। বইটি প্রকাশ করেছে নবযুগ প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন মানযারে শামীম। দাম ৩২০ টাকা।

প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে : কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের উপন্যাস। বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে অবলম্বন করে লেখক তুলে ধরেছেন অন্যতর এক আখ্যান। তাতে যেমন প্রেম-ভালোবাসা রয়েছে তেমনি রয়েছে রোমাঞ্চকর অভিযাত্রাও। লেখক অত্যন্ত ঝরঝরে ভাষায়, আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন শিমু নামের এক প্রেমের দুঃসাহসিক অভিযান, তুলে ধরেছেন হাসি-কান্নার স্বরলিপি। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন মাসুক হেলাল। দাম ৪০০ টাকা।

গণআদালত : মননশীল নিবন্ধের বইটি লিখেছেন মিডিয়াব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক নঈম নিজাম। প্রকাশ করেছে অন্বেষা। প্রচ্ছদ করেছেন শাকীর এহসানুল্লাহ। বইটিতে স্থান পেয়েছে নব্বইয়ের দশকে গড়ে ওঠা গণআদালত সম্পর্কে লেখকের নানামুখী বিশ্লেষণ। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রাজ্ঞতা তাঁর লেখায় যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি এসেছে তত্কালীন রাজনীতির ভেতর-বাহিরও। তাঁর রচনার ভাষা আকর্ষণীয়, ঝরঝরে। ভাষাশৈলী সহজ ও সুখপাঠ্য। পড়তে গিয়ে পাঠক নিজেও হয়ে উঠবেন একজন বিশ্লেষক, রাজনীতিসচেতন। বইটির মূল্য ১৩৫ টাকা।

নতুন বই : গতকাল মেলার সপ্তম দিনে নতুন ১২১টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৮, উপন্যাস ১৭, প্রবন্ধ ১২, কবিতা ৩১, গবেষণা ১, শিশুসাহিত্য ৩, মুক্তিযুদ্ধ ৪, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ২, রাজনীতি ২, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১, রম্য/ধাঁধা ১, ধর্মীয় ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ৩ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ২৩টি বই রয়েছে।

গ্রন্থমেলায় এসেছে কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের দীর্ঘ ক্যানভাসের উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’। বইটিতে ইতিহাসের আশ্রয়ে লেখক তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সূচনাপর্ব, তুলে ধরেছেন রাজনীতির নানা অলিগলি। মননশীল পাঠকের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। মূল্য ৫০০ টাকা।

মেলায় এসেছে কবি ও সাংবাদিক ফখরে আলমের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি’। প্রকাশ করেছে ‘বিদ্যাপ্রকাশ’।

মেলায় আসা নতুন বইগুলোর মধ্যে মেরিট ফেয়ার প্রকাশন এনেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ’, শোভা প্রকাশ এনেছে তারেক শামসুর রেহমানের ‘নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা ও সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি’, নালন্দা এনেছে গোলাম কুদ্দুছের ‘কালের ধ্বনি’, সময় প্রকাশন এনেছে ইকবাল হাসানের ‘আলো আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ’ ইত্যাদি।

মূল মঞ্চের আয়োজন : গতকাল গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা ভাষার প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোস্তাফা জব্বার। আলোচনায় অংশ নেন নজরুল ইসলাম খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন তিমির নন্দী, বুলবুল মহলানবীশ, মাহমুদ সেলিম ও সন্দীপন দাস।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ বুধবার গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সরদার জয়েনউদ্দিনের জন্মশতবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচনায় অংশ নেবেন বায়তুল্লাহ কাদেরী, হরিশংকর জলদাস ও মোবাশ্বিরা ফারজানা মিথিলা। সভাপতিত্ব করবেন মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


মন্তব্য