kalerkantho


পরিচিতি সভা ডেকে বাতিল

অতি সতর্ক হলেন নতুন সিইসি

আশরাফুল হক রাজীব   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অতি সতর্ক হলেন নতুন সিইসি

কে এম নুরুল হুদা

সব কিছু ঠিকঠাক। বিকেল ৪টায় পরিচিতি সভায় বসবে নবগঠিত নির্বাচন কমিশন।

প্রস্তুত মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষ। কমিশনারদের আপ্যায়নের মতো খুচরা বিষয়গুলোও চূড়ান্ত। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে হাজির। কিন্তু হঠাৎ করেই মন্ত্রিপরিষদসচিবের একান্ত সচিব নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। কী ব্যাপার! নির্বাচন কমিশন সচিব চলে গেলেন কেন? সভা হবে না? পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিব চলে যাওয়ায় সভা যে হবে না এটাই তো স্বাভাবিক। খোঁজ করে দেখুন কেন হলো না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বিতর্কের ভয়ে সভাটি বাতিল করা হয়েছে। কী নিয়ে বিতর্কের আশঙ্কা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। শপথ নেওয়ার আগেই তারা নির্বাহী বিভাগে এসে কেন সভায় বসল—এ প্রশ্ন উঠতে পারে।

কে পরিচিতি সভাটি ডেকেছিলেন—জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নিজেই এ সভা ডেকেছিলেন।

যোগাযোগ করা হলে নুরুল হুদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিশনারদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যই সবাইকে ডেকেছিলাম। একেকজন একেক সেক্টর থেকে এসেছেন। সবার সঙ্গে পরিচয় হওয়া দরকার। এই ভাবনা থেকেই ডাকা। ’

সভাটি নির্বাহী বিভাগের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কেন—কালের কণ্ঠের এই প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘যেহেতু আমরা শপথ নিইনি, সে কারণে নির্বাচন কমিশনে যেতে পারি না। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, তারা এই ইসি গঠনে সাচিবিক সহায়তা দিয়েছে। তা ছাড়া কমিশনারদের অনেকে নির্বাহী বিভাগেই চাকরি করেছেন। তাঁদের কাছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন কিছু নয়। তাঁদের কর্মস্থল ছিল সচিবালয় বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ কারণেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া বিতর্কের কিছু দেখি না। আমরা সবাই বড় একটা দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছি। শপথ নেওয়ার আগে একসঙ্গে বসে চা পান করা বা পরিচিত হওয়ার মধ্যে বিতর্কের কিছু নেই। কিন্তু অনেকেই বলেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বসলে বিতর্ক হতে পারে। তাই আমরা আজকে (গতকাল মঙ্গলবার) আর বসছি না। ’

আগামীকাল (আজ বুধবার) বা এর পরদিন কি বসতে পারেন? জবাবে সিইসি জানালেন, ‘সেই সুযোগও আর দেখছি না। আমি কয়েক দিন ব্যস্ত থাকব। ’

সরকার গত সোমবার কে এম নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করে। একই দিনে চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

নির্বাচন কমিশন গঠনের পর নতুন কমিশন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। কে এম নুরুল হুদা সাবেক সচিব হলেও সচিবালয়ের বেশির ভাগই তাঁকে চেনেন না। কারণ তিনি সচিব হলেও কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব ছিলেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ সফিউল আলম বলেন, ‘কে এম নুরুল হুদাকে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা দিয়ে সচিব করা হয়েছে। সার্ভিস থেকে বিদায় করে দেওয়ার পর ফিরিয়ে এনে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কোনো বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। ’

সচিবালয়ে রক্ষিত কে এম নুরুল হুদার পিডিএস থেকে জানা যায়, তিনি বিসিএস ১৯৭৩ সালের একজন সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মাগুরা ও যশোরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উপসচিব পদে পদোন্নতি পান কে এম নুরুল হুদা।

এরপর ফরিদপুর ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন নুরুল হুদা। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকারের যুগ্ম সচিব হন। জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের দায়িত্বেও ছিলেন নুরুল হুদা। ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের সময় বিএনপি ক্ষমতায় এসে ২০০১ সালের ৮ ডিসেম্বর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়।

এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে তাঁকে চাকরিতে ফিরিয়ে এনে ভূতাপেক্ষ (পেছনের তারিখ থেকে) পদোন্নতি দেয়। সে সময় অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়ায় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি।

এরপর কর্মজীবনে ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ছিলেন পাঁচ বছর। নর্থওয়েস্ট জোন কম্পানির চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।

 ১৯৪৮ সালে পটুয়াখালীর বাউফলে জন্মগ্রহণ করেন কে এম নুরুল হুদা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন নতুন সিইসি। এ ছাড়া ১৯৭২-৭৩ সালে হল ছাত্রসংসদে সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন নুরুল হুদা। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পটুয়াখালী জেলাকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করায় ভূমিকা রাখেন। স্ত্রী হুসনে আরার সঙ্গে নুরুল হুদার সংসারে তিন ছেলেমেয়ে রয়েছে।


মন্তব্য