kalerkantho


সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন

গাইবান্ধার এসপিকে প্রত্যাহারের নির্দেশ হাইকোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গাইবান্ধার এসপিকে প্রত্যাহারের নির্দেশ হাইকোর্টের

গাইবান্ধায় সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগানোর ঘটনায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্তে সহযোগিতা না করায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলামকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আগুন লাগানোর দিন চামগাড়ী বিল এলাকায় দায়িত্বরত সব পুলিশ সদস্যকেও প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে এ আদেশ কার্যকর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের আইজি এবং রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া আল-জাজিরা টিভিতে যে আগুন লাগানোর ভিডিও চিত্র প্রচারিত হয়েছে তা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দাখিল করতে পুলিশের আইজি এবং রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত বলেন, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা থাকতে হবে। যেহেতু বিষয়টি আদালতে এসেছে, তাই আদালতের দায়িত্ব হলো দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তা ছাড়া কতিপয় পুলিশ সদস্যের কারণে পুরো পুলিশ প্রশাসন কলঙ্কিত হতে পারে না। সে জন্যই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

গতকাল আদালতে রিট আবেদনকারীপক্ষে অ্যাডভোকেট এ এম আমিনউদ্দিন এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু শুনানি করেন।

আদালতের নির্দেশে গতকাল বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন থেকে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট এ এম আমিনউদ্দিন।

একপর্যায়ে এ এম আমিনউদ্দিন বলেন, ওই দিন ঘটনাস্থলে কারা দায়িত্বরত ছিল এবং কারা আগুন ধরিয়েছে তাদের তালিকা এসপির কাছে চেয়েছিলেন সিজিএম। কিন্তু এসপি তা দেননি।

ওই সময় আদালত বলেন, ‘এসপি কি সহযোগিতা করেননি?’ এরপর আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজুর বক্তব্য জানতে চান। মোতাহার হোসেন সাজু প্রতিবেদন থেকে সংশ্লিষ্ট অংশ পড়েন। তিনি বলেন, ‘এসপি সাহেব তালিকা দিয়েছেন। ’ ওই সময় তিনি একটি তালিকা আদালতকে দেখান। তিনি বলেন, তবে ওই এলাকায় কারা দায়িত্বে ছিল এবং কারা আগুন লাগিয়েছে তাদের চিহ্নিত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই।

এরপর এ এম আমিনউদ্দিন বলেন, ‘দায়িত্বরত কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী করেছে? তাদের সামনে আগুন লাগবে কেন? তাদের কাজ কী?’ তিনি আরো বলেন, ‘হয়তো এসপি বা ওসি সাহেব আগুন দেননি। তবে তাঁদের সামনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আগুন দিয়েছে। তাঁরা কি সেখানে তামাসা করতে গিয়েছিলেন?’

ওই সময় আদালত বলেন, ‘সিজিএমকে কেন সহযোগিতা করেনি? হাইকোর্টের নির্দেশে সিজিএম তদন্ত করছেন অথচ তাঁকে সহযোগিতা করা হয়নি! এসপি কি সিজিএমকে হাইকোর্ট দেখিয়েছে?’ আদালত এভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আদেশ দেন। এ ছাড়া পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৯ মার্চ দিন ধার্য করেন।

গত বছর ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাঁওতাল পল্লীতে জমি দখল নিতে গেলে চিনিকল কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ বাধে। ওই সময় গুলিবর্ষণও করা হয়। এতে তিন সাঁওতাল পুরুষ নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। ওই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে আল-জাজিরা টিভিতে একটি ভিডিওচিত্র প্রচারিত হওয়ার পর ব্যাপক তোলপাড় হয়। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আদালতের নজরে আনে রিট আবেদনকারীপক্ষ। এরপর আদালত গত বছর ১২ ডিসেম্বর এক আদেশে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। সাঁওতালদের বাড়িঘরে কারা আগুন লাগিয়েছে এবং ওই ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত কি না তা তদন্ত করতে বলা হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ঘটনা তদন্ত করেন গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজিএম) মো. শহিদুল্লাহ। কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করতে তদন্তকালে তথ্য চেয়ে এসপিকে চিঠি দেন সিজিএম। এর জবাবে এসপি বলেন, আগুন লাগানোর বিষয়ে ভিডিওচিত্রের ফরেসনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন। এ ছাড়া ওই ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। এ অবস্থায় তদন্ত শেষ করে হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন সিজিএম। গত ৩১ জানুয়ারি ওই প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পুলিশ সদস্য ও এক ডিবি সদস্যকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। তবে তারা হেলমেট পরা থাকায় তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। এ অবস্থায় আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য ৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন।

সাঁওতালরা সন্তুষ্ট : আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, হাইকোর্ট গাইবান্ধার এসপি মো. আশরাফুল ইসলাম এবং ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেওয়ায় সাঁওতালরা সন্তোষ প্রকাশ করেছে। গতকাল আদালতের নির্দেশের কথা প্রচার হলে গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের সাঁওতালপল্লী জয়পুর ও মাদারপুরের বাসিন্দারা পরস্পরের কাছে আনন্দ প্রকাশ করে। মাদারপুরের বাসিন্দা ও সাঁওতাল নেতা রাফায়েল হাসদা বলেন, ‘উচ্চ আদালতের এ আদেশে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। গত ৬ নভেম্বর আমাদের সমপ্রদায়ের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, আদালত তার সঠিক মূল্যায়ন করে আদেশ দিয়েছেন। ’

সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার কমিটির সহসভাপতি ডা. ফিলিমন বাসকে বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে আদালত যে আদেশ দিয়েছেন তাতে আমরা সাঁওতাল সমপ্রদায়ের মানুষ সন্তুষ্ট। আমরা এখন পিবিআইয়ের রিপোর্টের প্রত্যাশায় রয়েছি। ’

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাব বলে আশা করছি। অপরাধের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা। ’


মন্তব্য