kalerkantho


মর্মান্তিক

সড়কে ঝরল ব্যাংকার ও পরীক্ষার্থীর প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সড়কে ঝরল ব্যাংকার ও পরীক্ষার্থীর প্রাণ

রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতনের ছাত্র সাকিবুল ইসলাম (১৭)। এবার সে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল।

গতকাল মঙ্গলবার ছিল ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা। ছেলেকে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে মা ফরিদা ইয়াসমিনও রওনা হন। দ্রুত পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছতে তারা বাসে ওঠে। পরীক্ষার্থী সাকিবুল বাসের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখছিল। আচমকা একটি ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে তার মাথা ধাক্কা লাগে। এতে গুরুতর আহত হয় সাকিবুল। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।   গতকাল রাজধানীর মহাখালীর আমতলী এলাকায় মায়ের সামনে এসএসসি পরীক্ষার্থী সন্তানের মৃত্যু হয়। পুলিশ বিনিময় পরিবহন নামের বাসটি আটক করেছে। তবে বাসটির চালক পালিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণেই রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা লেগে সাকিবুলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় বাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বনানী থানার এসআই গোলাম রব্বানী বলেন, আমতলীতে চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে মাথা বের করেছিল সাকিবুল। সকাল সোয়া ৯টার দিকে একটি ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মাথায় গুরুতর আঘাত পায় সে। প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সকাল পৌনে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকিবুলকে মৃত ঘোষণা করেন। সাকিবুলের কাছে প্রবেশপত্র ও আইডি কার্ড পাওয়া গেছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘এই ঘটনায় বাসের চালকের গাফিলতি আছে। বিনিময় পরিবহনের বাসটিকে আটক করা হয়েছে। তবে চালক পলাতক। মামলা হবে। ’

সাকিবুলের মা ফরিদা ইয়াসমিন সন্তানের লাশ নিয়ে বিলাপ করে বলেন, ‘পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল। ওর পরীক্ষার টাইম চলে যাচ্ছে। আমার ছেলেটা বড় ভালো ছাত্র...। ’ মায়ের কান্নায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।  

স্বজনরা জানায়, সাকিবুলের বাবা জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার হরিহরপাড়া গ্রামে। দুই ভাইয়ের মধ্যে সাকিবুল ছোট। বড় ভাই রাকিবুল ইসলাম বুয়েটে পড়ছে। সাকিবুল বনানী বিদ্যানিকেতনের ছাত্র ছিল। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল সে। রাজধানীর দক্ষিণ বাড্ডার ক-১১৮ নম্বর বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকত সাকিবুল। তার এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল ক্যান্টনমেন্টের শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।  

সাকিবুলের চাচাতো ভাই ইসহাক রহমান বলেন, গতকাল সকাল ৯টার দিকে সাকিবুলকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে দক্ষিণ বাড্ডার বাসা থেকে বের হন মা ফরিদা ইয়াসমিন। তারা বিনিময় পরিবহনের একটি বাসে ওঠে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসটি মহাখালীর আমতলী এলাকায় পৌঁছলে জানালা দিয়ে বাইরে মাথা বের করে সাকিবুল। এ সময় আচমকা একটি ল্যাম্পপোস্টে আঘাত লাগে তার।

গতকাল দুপুরে সাকিবুলের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে দক্ষিণ বাড্ডা এলাকায় নেওয়া হয়। আসরের নামাজের পর সেখানে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নেওয়া হয় তার লাশ। সেখানে এশার নামাজের পর দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার লাশ স্থানীয় পঞ্চবটি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

অফিসে যাওয়ার পথে ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত : এদিকে গতকাল সকালে টিকাটুলি ইত্তেফাক মোড়ে নিয়ন্ত্রণহীণ বাস সড়কদ্বীপে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এতে চাপা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক গোলাম হোসেন (৪৬) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জালাল উদ্দিন (৫৬), সুজন (২৮) ও সাহিদা (৪৫) নামে আরো তিনজন আহত হয়েছেন। তাঁদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্বজনরা জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম হোসেন হেঁটে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। আর আহতরা সবাই ৮ নম্বর রুটের ওই বাসটির যাত্রী ছিলেন।

নিহতের বড় ছেলে সালমান হোসেন পরান জানান, তাঁরা পূর্ব জুরাইনের মুরাদপুর হাই স্কুল রোডের ১১৫ নম্বর বাসায় পরিবারসহ থাকেন। তাঁর বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রতিদিন বাসা থেকে বের হয়ে কোনো দিন নিজের গাড়িতে আবার কোনো দিন রিকশায় করে অফিসে যেতেন। সম্ভবত গতকাল তিনি ইত্তেফাক মোড়ে কোনো কাজ শেষ করে হেঁটে অফিসে যাচ্ছিলেন। এ সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কদ্বীপে উঠে গেলে বাসচাপায়ই তিনি নিহত হন।

স্বজনরা জানায়, নিহত গোলাম হোসেনের বাবার নাম শুক্কুর আলী। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। তাঁর স্ত্রী আফরোজা সুলতানা স্বামীর মৃত্যুর সংবাদে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। শোকে কাতর হয়ে পড়েছে তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের ওয়ারী জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মুনতাসির রহমান বলেন, ‘চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ৮ নম্বর রুটের বাসটি সড়কদ্বীপে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। এতে গোলাম হোসেনসহ চারজন আহত হন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকরা গোলাম হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাহিদা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেও জালাল উদ্দিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সুজনের পা ভেঙে গেছে। তাঁরা তিনজন বাসের যাত্রী ছিলেন। তবে গোলাম হোসেন যাত্রী ছিলেন কি না নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ’ এসি আরো বলেন, এ ঘটনায় ঘাতক বাসটির চালক ও হেলপার পালিয়েছে। তবে বাসটি আটক করা হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গতকাল বিকেল ৩টার দিকে গোলাম হোসেনের লাশ বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর প্রথম জানাজা হয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘গোলাম হোসেন কর্মস্থলে আসার পথে বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন। তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য আমরা দুঃখ ও গভীর শোক প্রকাশ করছি। এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরও বিচার দাবি করছি। ’

মোটরসাইকেল থেকে পড়ে একজন নিহত : উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মাহবুবুল আলম খান জানান, গত সোমবার রাত ৮টার দিকে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের স্লুইস গেটসংলগ্ন কাঁচাবাজারের সামনের রাস্তায় চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পড়ে আহত হন খালেদ হাসান খান তৌফিক (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। পরে স্থানীয় মুনসুর আলী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তৌফিকের বাবার নাম মৃত মাকসুদুর রহমান খান। তাঁদের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে।


মন্তব্য