kalerkantho


জেএমবি ও শিবির হামলা চালায়

নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জেএমবি ও শিবির হামলা চালায়

বগুড়ায় শিয়া মসজিদে বন্দুক হামলা ও মুয়াজ্জিন হত্যার ঘটনায় অংশ নেয় জঙ্গিগোষ্ঠী জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও ইসলামী ছাত্রশিবির। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের হত্যায় দেশীয় জঙ্গিদের পরিকল্পিত হামলা ছিল সেটি।

ঘটনার প্রায় ১৪ মাস পর আদালতে দাখিল করা মামলার অভিযোগপত্রে এসব কথা বলা হয়েছে। যদিও হামলার এক দিন পর এর দায় স্বীকার করেছিল মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

আটক ও পলাতক ৯ জঙ্গির বিরুদ্ধে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত চারজন ছাড়াও সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে দিনাজপুরে ইসকন মন্দিরে হামলার দুই আসামিসহ পাঁচজনকে।

শিয়া মসজিদে হামলা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শিবগঞ্জ থানার ওসি কামরুজ্জামান মিয়া কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে বগুড়ার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালত-২-এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। গত রবিবার আমলি আদালতের বিচারক  মো. কামরুজ্জামান অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। শুনানির জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার চককানুপুর গ্রামে শিয়া মতাবলম্বীদের মসজিদ-ই-আল মোস্তফায় জঙ্গি হামলা হয়। হামলায় মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ চারজন গুলিবিদ্ধ  হন।

এর মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন (৫৮)।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বগুড়ায় শিয়া মসজিদে বন্দুক হামলায় অংশ নিয়েছিল জেএমবি ও ছাত্রশিবিরের প্রশিক্ষিত ১৩ সদস্য। এর মধ্যে চারজন কারাগারে, পাঁচজন পলাতক ও চারজন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। মসজিদে হামলা ও ইমাম-মুয়াজ্জিন হত্যার পরিকল্পনা বৈঠক হয়েছিল মহাস্থানগড়ে। পরে স্কুলব্যাগে অস্ত্র ও গ্রেনেড ভরে দুটি মোটরসাইকেলে করে ছয় জঙ্গি শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে যায় এবং শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদ-ই-আল মোস্তফায় হামলা চালায়।

যে ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তারা হলো জয়পুরহাট সদরের সোঠাহার গ্রামের ইয়াছিন আলী (৪০), বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার আটমুল গ্রামের ফকিরপাড়ার এমদাদুল হক (২৮), একই গ্রামের কুলুপাড়ার আবদুল বাছেদ (২৭), পূর্বপাড়ার আবদুল হামিদ ওরফে হামিদুল (২২), শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া গ্রামের আবদুল মমিন মণ্ডল (২৫), ক্ষুদ্র কুষ্টিয়া গ্রামের রাজিবুল ইসলাম ওরফে বাদল (২৬), গাবতলী উপজেলার গোরদহ সরকারপাড়ার খাদেমুল ইসলাম ওরফে বাদশা (২৪) ও আজাদ প্রামাণিক (২৪), গাইবান্ধা সদরের তিনদহ পশ্চিমপাড়ার আজাদুল কবিরাজ ওরফে বিপ্লব (৩২)।

এর মধ্যে ইয়াসিন, এমদাদুল, বাসেদ ও মমিনকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তারা কারাগারে রয়েছে। বাদল, হামিদুল, খাদেমুল, আজাদ ও বিপ্লব পলাতক রয়েছে। ইয়াসিন হামলার আদ্যোপান্ত জানিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় যে পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে, তাঁরা হলো জেএমবির পুরনো সদস্য শিবগঞ্জের সৈয়দ দামগাড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন ওরফে আর্মি আনোয়ার,  মোলামগাড়ি গ্রামের কওমি মাদরাসার অধ্যক্ষ শামসুল আলম, হরিপুর গ্রামের মাদরাসা ছাত্র জুয়েল রানা, দিনাজপুরে ইসকন মন্দিরে হামলা মামলার আসামি দুই জেএমবি সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে ডেনিস ও মোবাশ্বের আলম খন্দকার ওরফে প্রিন্স।

হামলায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক একে-২২ রাইফেলসহ অন্যান্য অস্ত্র আলামত হিসেবে উদ্ধারের কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা কামরুজ্জামান মিয়া বলেন, শিয়া মসজিদে হামলা ও পরিকল্পনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও শিবিরের ১৩ সক্রিয় সদস্য সরাসরি যুক্ত ছিল। এর মধ্যে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ছয়জনের মধ্যে চারজনই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে কে কে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং এ হামলায় শিবির জড়িত থাকার কী ধরনের প্রমাণ তাঁদের হাতে আছে সে ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তা কিছু বলেননি।  

হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের মধ্যে জয়পুরহাটের কমর গ্রামের মিজানুর রহমান ওরফে কাওছার গত বছরের ৮ জুন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। গত বছরে এর আগের দিন রাজধানীর পল্লবী এলাকার কালশী সেতুর কাছে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মিঠাপুকুর গ্রামের সুলতান মাহমুদ ওরফে কামাল ওরফে রানা ও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কানুপুর গ্রামের তারেক হোসেন ওরফে মিলু ওরফে ওসমান। এরপর ৭ আগস্ট রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকড়ার জোয়ানভাগ এলাকায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় নওগাঁর মান্দা উপজেলার পারইল গ্রামের আনোয়ার হোসেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, শিয়া মসজিদে হামলার মামলায় ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জয়পুরহাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় জেএমবি সদস্য ইয়াছিন আলীকে। তিনি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। একই দিন শিবগঞ্জ থেকে  জেএমবির দুই সদস্য আবদুল বাছেদ ও এমদাদুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। ১২ ডিসেম্বর ইয়াসিন আলী বগুড়ার জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম  ফেরদৌস ওয়াহিদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে ইয়াসিন হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন তিন ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ব্যঙ্গ করে। এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং মসজিদে হামলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ’

ইয়াছিনের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গত বছরের ২৬ এপ্রিল বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার কামারপাড়া-মধ্যপাড়া গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের ছাত্র আবদুল মমিনকে (২৫)। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হামলায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একে-২২ রাইফেল, একটি বিদেশি পিস্তল ও ৫২টি তাজা গুলি।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলার আগে জঙ্গিরা হরিপুর মসজিদ-ই-আল মোস্তফায় গিয়ে রেকি করে আসে। মাগরিবের নামাজে আসা মুসল্লিদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর দুটি মোটরসাইকেলে করে কাওছার, রানা, বিপ্লব, বাদশা, বাদল ও আনোয়ার মহাস্থানগড়ে দিয়ে একত্র হয়। সেখান থেকে স্কুলব্যাগে ভরে অস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে জঙ্গিরা শিয়া মসজিদে হামলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মসজিদের পাশে একটি ইটভাটায় মোটরসাইকেল রেখে বাদল ও বিপ্লব অপেক্ষা করতে থাকে। আর কাওছার, আনোয়ার, রানা ও বাদশা মসজিদে হামলায় অংশ নেয়। তারা মসজিদের বাইরের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এরপর রানা মসজিদের মূল দরজা বন্ধ করে দেয়। জঙ্গি আনোয়ার রাইফেল দিয়ে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গুলি পিলারের সঙ্গে লাগে। এরপর কাওছার গুলি চালায়। তার গুলিতে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও দুই মুসল্লি গুলিবিদ্ধ হন। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই হামলা শেষ করে দ্রুত পালিয়ে যায় জঙ্গিরা।

এ ঘটনায় মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ সোনা মিয়া বাদী হয়ে ওই রাতেই শিবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন।


মন্তব্য