kalerkantho

একাত্তরের দলিল

আন্দালিব রাশদী

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



একাত্তরের দলিল

দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড ২৯ মার্চ ১৯৭১ সম্পাদকীয়তে লিখেছে, পৃথিবী জেনে গেছে পাকিস্তান আর অখণ্ড নেই। ভেঙে একেবারে দুই টুকরো।

অলৌকিক কোনো রাজনৈতিক ঘটনা ছাড়া পাকিস্তানকে এক করার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।

একাত্তরের দলিল আমার লেখা বিদেশির চোখে ১৯৭১ সালের একটি সম্পূরক, কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রন্থ। একাত্তরের ২৬ মার্চের পর থেকে পাকিস্তানও বিদেশ, পাকিস্তানি পত্রিকাও বিদেশি পত্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েকটি একদা গোপনীয় দলিল, সিআইএর প্রতিবেদনসহ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন, ভাষ্য, সম্পাদকীয়, সাক্ষাত্কার, বিশিষ্ট সাংবাদিকদের সরেজমিনে বাংলাদেশ পরিদর্শনের বিবরণ এই গ্রন্থে অনূদিত হয়েছে; কিছু পাকিস্তানি বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে শেষ ফ্লাইট ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ রচনাটিও উপেক্ষিত হওয়ার নয়। ইতিহাস গবেষকরা এর থেকে প্রণোদিত  হবেন।

এটি টীকা-টিপ্পনী ও সূত্রের ভারে জর্জরিত গবেষণা গ্রন্থ নয়। অনূদিত প্রতিবেদন, ভাষ্য ও পর্যালোচনার মূল ভাষ্য মুক্তিযুদ্ধের দলিল, বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, আমেরিকান পেপার্সসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, মিলিটারি জার্নাল, বিভিন্ন গ্রন্থ ও ইন্টারনেট থেকে আহরণ করেছি, কৃতজ্ঞতা উৎসগুলোর প্রণেতাদের কাছে। আমারই অনূদিত ৬০ জনের সাক্ষ্য থেকে কিছু সাক্ষ্য এখানে উদ্ধৃত করতে হয়েছে।

সংকটের সময় বুদ্ধিজীবীর মাথা কচ্ছপের মাথার মতো শক্ত খোলসের ভেতরে ঢুকে যায়। সরকারের অনুগ্রহভাজন বুদ্ধিজীবী সব আমলেই সরকারের সাফাই গান। গাইতে না পারলে পালিয়ে বেড়ান, নিশ্চুপ থাকেন। একাত্তর সেই সাক্ষ্য দেয়। একাত্তরের বাংলাদেশ বিদেশি বুদ্ধিজীবীদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে, বিবেকতাড়িত সেই সব বুদ্ধিজীবী সংগ্রামী মানুষের পাশে, অসহায় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

১৯৭১ সালের গোপনীয় মার্কিন ডকুমেন্টস ডিসেম্বরের অনেক আগেই বলে দিয়েছে, বাংলাদেশের বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। এতে সংযুক্ত হয়েছে হেনরি কিসিঞ্জারের মেমোরেন্ডাম, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও আমেরিকার হিসাব-নিকাশ, কিসিঞ্জারকে নিয়ে বাংলাদেশ আলোচনা, নিক্সনের জন্য হেনরি কিসিঞ্জারের স্মারক, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান সিচুয়েশন রিপোর্ট, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সিআইএর গোয়েন্দা স্মারক এবং সব শেষে নিক্সনও ইয়াহিয়াকে রক্ষা করতে পারলেন না।

আরেকটি ভেতর কাহিনী : মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকারও মরছে। সেই রাজাকারদের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকারের করণীয় কিছুই কি ছিল না? যশোর জেলা প্রশাসনের একটি ইংরেজি পত্র সদর, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও নড়াইলের মহকুমা প্রশাসককে পাঠনো হয়েছে। সেই পত্রের অনুবাদ :

বিষয় : মৃত রাজাকার ও শান্তি বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের জন্য জিয়ার গম বরাদ্দ প্রসঙ্গে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, দুষ্কৃতকারীর হাতে নিহত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের পরিবারবর্গের সহায়তার জন্য জিআর (খয়রাতি ত্রাণ) গম প্রদান করা হবে। এ উদ্দেশ্যে নিম্নবর্ণিত বণ্টন অনুযায়ী এক হাজার মণ জিআর গম বরাদ্দ করা হয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম অর্থাৎ পরিবারের পূর্ণ বয়স্কদের জন্য মাথাপিছু সপ্তাহে তিন সের এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের দেড় সের হিসেবে মাস্টাররোল সংরক্ষণের মাধ্যমে বিতরণ করা যাবে।

মহকুমা প্রশাসক সদর ৪০০ মণ, মহকুমা প্রশাসক ঝিনাইদহ ২০০ মণ, মহকুমা প্রশাসক মাগুরা ২০০ মণ, মহকুমা প্রশাসক নড়াইল ২০০ মণ, মোট এক হাজার মণ।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে শেষ ফ্লাইট : এ অধ্যায়ে লেখা হয়েছে : আমাদের জাহাজ চালু হলো, টেকঅফ করল, এয়ারপোর্টে যেখানে জেনারেল অরোরাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে, সেই রিসেপশন লাইনের ওপর দিয়ে আমরা উড়ে গেলাম। গাছগাছালি পাশ কাটিয়ে আমরা দক্ষিণে চলেছি। চট্টগ্রাম থেকে খানিকটা দূরে থাকতেই ফুয়েল ফিল্টারের সতর্কতা বাতি জ্বলে উঠল। মানে পাইপে জ্বালানি আটকে গেছে। এটা পরিষ্কার করতে হবে অথবা পাল্টাতে হবে নতুবা কয়েক মিনিটের মধ্যে ইঞ্জিন তেলশূন্য হয়ে পড়বে। আমরা তখনো শত্রুর সীমানার ভেতর, কাজেই বেপরোয়া হয়ে আমরা পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে আরাকান অরণ্যে খানিকটা খালি জায়গা পেয়ে সেখানে ল্যান্ড করি।

কেনেডির সাক্ষ্য : সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি চলে এসেছেন একাত্তরের শরণার্থী শিবিরে। তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন : এই কঠিন ট্র্যাজেডি এখনো পৃথিবী বুঝে উঠতে পারেনি। আমি আপনাদের বলতে পারি, যতক্ষণ না নিজ চোখে দেখছেন, এর বিশাল ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণাও করতে পারবেন না। শুধু সেখানে গেলেই সেখানকার অনুভূতিটা আপনি আঁচ করতে পারবেন, মানুষের ভোগান্তি বুঝতে পারবেন, সহিংসতার যে শক্তি শরণার্থীর জন্ম দিচ্ছে এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে যাচ্ছে, তা অনুধাবন করতে পারবেন। ভারতে থাকাকালে পূর্ব বাংলার সীমান্তজুড়ে ছড়ানো শরণার্থী এলাকাগুলো আমি ঘুরে দেখেছি; কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার পশ্চিমে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত, উত্তরে দার্জিলিং এবং পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা ঘুরে এসেছি।

একাত্তরের অজানা অনেক বিষয়ের জানালা খুলে দেবে এই গ্রন্থ। বইটি বের করেছে আলোঘর প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছেন শতাব্দী জাহেদ, মূল্য ৪৫০ টাকা।


মন্তব্য