kalerkantho


২৮ নারী আরো এক দিনের রিমান্ডে

বৈঠকটি ছিল জামায়াতের পাঁচ জেলার নারী সম্মেলন

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বৈঠকটি ছিল জামায়াতের পাঁচ জেলার নারী সম্মেলন

আগামী জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে নারী কর্মীদের সামনে রেখে গোপনে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াত-শিবির। পাশাপাশি উগ্র মৌলবাদী তথা জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর সংগঠনটির নারী কর্মীদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য মিলেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

গত শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাড়ি থেকে জামায়াতের ১৫ জন রুকনসহ ২৮ নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে তাঁদের ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে থানা পুলিশ। দুই দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল সোমবার আদালতে পাঠিয়ে আরো এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরের ওই বাসা কয়েক বছর ধরে জামায়াতের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল। গত শুক্রবার ওই বাসায় গোপন বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের নারী নেত্রীরা মাঠপর্যায়ে দলের জন্য কী ধরনের ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে আলোচনা করা। আটক ২৮ জনের মধ্যে ঢাকা ছাড়াও পাবনা, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও চাঁদপুর জেলা জামায়াতের নারী রুকন রয়েছেন। অর্থাৎ ওই বৈঠক ছিল মূলত জামায়াতের নারী সম্মেলন। এ ছাড়া আটকদের একজন সাকিরা তাসনিম জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ভাই আলী আকরামের স্ত্রী।

মামলার তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) হাফিজ আল ফারুক বলেন, জামায়াতের নারী ইউনিটের শীর্ষ পর্যায়ের এসব সদস্য ঢাকা ছাড়াও দেশের পাঁচটি জেলায় জামায়াত-শিবিরের পক্ষে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন, সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড, নাশকতা, মাঠপর্যায়ে নারী সদস্য সংগ্রহসহ দলের নানা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে তাঁরা মোহাম্মদপুরের ওই বাসায় জড়ো হন। রিমান্ডে তাঁরা এটা জামায়াতের পাঁচটি জেলার নারী সম্মেলন বলে স্বীকার করেছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা রিমান্ডে জানিয়েছেন যে তাঁদের দলে তিন শতাধিক মাঠকর্মী রয়েছে। তারা সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দলীয় সিদ্ধান্তে তারা সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে গোপন বৈঠক করে থাকে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সব ধরনের তথ্য সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কাছে পৌঁছে দেয়।

রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের উল্লেখ করে পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতরা ঢাকাসহ সারা দেশে ধর্ম প্রচারের নামে জঙ্গিগোষ্ঠীর এজেন্ট হয়ে কাজ করছিল। গ্রামের সহজ-সরল নারীরা ছিল তাদের প্রধান টার্গেট। এ ছাড়া জামায়াত-শিবিরের পক্ষে তারা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মধ্যেও লিফলেট বিতরণ করত।

পুলিশ বলছে, জামায়াতের ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন ছাত্রশিবির এসব নারী সদস্যকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। গোপনে তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উগ্র-জিহাদি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। গ্রেপ্তার ২৮ নারীর প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে বুকলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলোর প্রতিটিতে কমপক্ষে ১০ জনের নাম রয়েছে। সব মিলিয়ে ২৮ নারীর বুকলেটে অন্তত ২৫৩ জন নারীর নাম পাওয়া গেছে, যাদের তারা টার্গেট করে দলভুক্ত করার চেষ্টায় ছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘তদন্তে গ্রেপ্তারকৃতদের সঙ্গে উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকার তথ্য মিলেছে। ’

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘জামায়াত-শিবির বরাবরই দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। সরকারকে বিপাকে ফেলতে তারা উগ্র-মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। তাদের ধরতে সারা দেশে র‌্যাবের টিম কাজ করছে। ’

তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দাবি করেন, কোরআন-হাদিস নিয়ে আলোচনা করতেই জামায়াতের ২৮ নারী সদস্য মোহাম্মদপুরের ওই বাড়িতে জড়ো হয়েছিলেন।

গ্রেপ্তার ও রিমান্ড : মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের ১১/৭ নম্বর বাসা থেকে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয় ২৮ নারীকে। এরপর দুই দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল তাঁদের আদালতে হাজির করে ফের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) শরিফুল ইসলাম।

আবেদনে বলা হয়, তাঁরা সবাই জামায়াত ও ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে জড়িত। কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্য। সবাই উচ্চশিক্ষিত। তাঁদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ডাক্তারও আছেন। আটকের সময় তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের বই, লিফলেট ও নাশকতার পরিকল্পনার নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বৈঠকের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তাঁদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম জাকির হোসেন টিপু এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নাম-পরিচয় : গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মহিলা জামায়াতের সেক্রেটারি বা সভানেত্রী শাহনাজ বেগম, রুকন—নাইমা আক্তার, জোহরা বেগম, সৈয়দা শাহীনা আক্তার, জেসমিন খান, সালমা হক, সাকিরা তাসনিম, সেলিমা সুলতানা সুইটি, হাফসা, আকলিমা ফেরদৌস, রুবিনা আক্তার, আসমা খাতুন, আনোয়ারা বেগম, উম্মে আতিয়া, রুমা আক্তার ও রহিমা খাতুন; সাথী—উম্মে কুলসুম ও খোদেজা আক্তার, সদস্য—রোকসানা বেগম, শরীফা আক্তার ও তাসলিমা; কর্মী—উম্মে খালেদা, ইয়াসমিন আক্তার ও আফসানা মিমি এবং সমর্থক—রাজিয়া আক্তার, সুফিয়া, সাদিয়া ও ফাতেমা বেগম।

অভিযানকালে বাসাটি থেকে উদ্ধার করা হয় লিফলেট, সংগঠনের মাসিক রিপোর্ট ফরম, গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর লেখা বই। তবে পুলিশ ঘরে প্রবেশের আগেই তাঁরা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজ ও নথি নষ্ট করে ফেলেন।

পুলিশ জানায়, বাসাটি মূলত সরকারি। সদ্য অবসরে যাওয়া পিডাব্লিউডির প্রকৌশলী এ কে এম জয়নাল আবেদিনের নামে এটি বরাদ্দ নেওয়া ছিল। তিন মাস আগে তিনি অবসরে যান এবং ১৫ দিন আগে তাঁর নামে বাড়িটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের একজন শাহনাজ বেগম ওরফে জোসনা বেগম জয়নাল আবেদিনের স্ত্রী।


মন্তব্য