kalerkantho


অশ্রুমাখা ভালোবাসায় ‘সেনদা’কে শেষবিদায়

সিলেট অফিস ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অশ্রুমাখা ভালোবাসায় ‘সেনদা’কে শেষবিদায়

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর মরদেহ গতকাল দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

অগণিত মানুষ শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় বিদায় জানাল প্রবীণ রাজনীতিক ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। গতকাল সোমবার সকালে হেকিপ্টারে করে ঢাকা থেকে তাঁর মরদেহ প্রথমে সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে তাঁর নিজ গ্রামে। সেখানে আরেক দফা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সিলেট ও সুনামগঞ্জে হাজির হয়েছিল হাজারো মানুষ। তাদের মধ্যে বর্ষীয়ান এ রাজনীতিকের সহকর্মী, দল-মত-নির্বিশেষে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষও ছিল। ভাটি অঞ্চলের প্রিয় মুখটি শেষবারের মতো দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিল সর্বস্তরের মানুষ, যাদের কাছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পরিচিত ছিলেন ‘সেনদা’ নামে। তাদের চোখে ছিল অশ্রু, বুকজুড়ে হাহাকার।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা ভেবেই প্রায় ২০-২৫ বছর আগে বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি চন্দনগাছ লাগিয়েছিলেন। নিজ হাতে লাগানো সুশোভিত ছায়াময় এই বৃক্ষের কাঠেই তাঁর শেষকৃত্য হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের এক অধ্যায়ের অবসান হলো।

দিরাই পৌর এলাকায় থানা রোডে তাঁর নিজ বাড়িটি বাংলো টাইপের। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়  দ্বিতল বাড়িটির সামনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু হয়। রাত পৌনে ৮টার দিকে ওই পর্ব শেষ হয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একমাত্র পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত বাবার মুখাগ্নি করেন। ওই সময় সৌমেনের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু নামে। উপস্থিত পুরোহিতসহ নেতাকর্মীরা এই দৃশ্য দেখে কেঁদে ওঠেন। সৌমেনের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দিরাই বাসভবনের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকারী ধীরেন্দ্র দাস।

সিলেট অফিস জানায়, মরদেহ আনা হবে—এমন খবরে গতকাল সকাল ৯টার আগে থেকেই সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারমুখো মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে মরদেহ সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের লাশ বহনকারী গাড়ি যখন পৌঁছায়, তখন চৌহাট্টা থেকে জিন্দাবাজার সড়কে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে সর্বস্তরের মানুষের এমন উপস্থিতি হৃদয় স্পর্শ করে সদ্যঃপ্রয়াত এ নেতার একমাত্র ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তেরও। সৌমেন বলেন, এত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে বাবা মানুষের মন জয় করতে পেরেছিলেন।

সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রস্তুত মঞ্চে সকাল ১১টায় শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। এতে যেমন আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, তেমনি বিএনপিসহ অন্য সংগঠনের নেতারাও যোগ দেন। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি ছাড়াও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র (সাময়িক বরখাস্তকৃত) আরিফুল হক চৌধুরীও যোগ দেন শ্রদ্ধা জানানোর মিছিলে। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে এ সময় চৌহাট্টা ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শ্রদ্ধা জানানোর এ আয়োজনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সরকারদলীয় হুইপ শাহাব উদ্দিন, বিরোধীদলীয় হুইপ সেলিম উদ্দিন, সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সংসদ সদস্য মজিদ খান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, ড. আবদুল মোমেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ প্রমুখ।

সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঘণ্টাব্যাপী শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে মরদেহ সুনামগঞ্জ সদরে আদালত চত্বরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘সেনদা’কে শ্রদ্ধা জানাতে সেখানেও জনতার ঢল নামে। পুলিশ লাইনের হেলিপ্যাড থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে যখন প্রিয় নেতাকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের জনতা। শহীদ মিনারে প্রায় ৫০ মিনিট মরদেহ রাখা হয়। এ সময় গার্ড অব অনার দিয়ে তাঁকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমনের নেতৃত্বে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগ। শ্রদ্ধা জানান অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ শাহাব উদ্দিন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ, সাংগঠনিক সম্পাদক সুব্রত পুরকায়স্থ, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল হুদা মুকুট, পৌর মেয়র আয়ূব বখত জগলুল, আজিজুস সামাদ আজাদ প্রমুখ।

দুপুর আড়াইটায় সুনামগঞ্জ থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ তাঁর নির্বাচনী এলাকা শাল্লা উপজেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে শাল্লা শাহিদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানায় উপজেলার সর্বস্তরের জনতা। সেখানেও গার্ড অব অনার শেষে আওয়ামী লীগ, অঙ্গসংগঠনের নেতারাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধা জানায়।

শাল্লা শাহিদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিম চন্দ্র দাশ। তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো মাটিগন্ধী নেতা জীবনে দেখেননি। তিনি মাঠঘাটের সাধারণের ভাষা বুঝতেন। সাধারণ মানুষই তাঁকে ২৮ বছর বয়সে সংসদ সদস্য করেছিল। শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ফজলুল হক নেতার মরদেহ দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তিনি বলেন, এমন নেতা আর জীবনে পাব না। আমরা জানি আমরা কাকে হারিয়েছি।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বন্ধুপ্রতিম রাজনীতিবিদ রামানন্দ দাস অশ্রু মুছতে মুছতে বলেন, আমাদের ভাটিকে আলোকিত করেছিলেন সুরঞ্জিত। তিনি নেতা না হলে আমাদের অবহেলিত ভাটিকে কেউ চিনত না। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা রবীন্দ্র বৈষ্ণব বলেন, ‘আমরার চাইরধার এখন আন্ধাইর লাগের। আমরার বাত্তি নিভি গেছে। নেতা অনেকেই হয়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো নেতা কমই হয়। ’

শাল্লা থেকে বিকেল ৪টায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় দিরাইয়ে। সেখানে প্রথমে দিরাই জগন্নাথ জিউর মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সোয়া ৪টায় লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বালুর মাঠে। পরে সুরঞ্জিতের নিজ বাড়ির প্রাঙ্গণে তার শেষকৃত্য হয়।

প্রসঙ্গত, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গত রবিবার ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও সাতবারের নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাবজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন।


মন্তব্য