kalerkantho

এ আমি অন্য কেউ

খালেদ হোসাইন

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এ আমি অন্য কেউ

চেনা-জানা পরিপার্শ্ব বদলে যাচ্ছে অতিদ্রুত, বদলে যাচ্ছে কাছের-দূরের মানুষ। এ যেন পরিবর্তনের স্বাভাবিকতা নয়, অদ্ভুত এক দুর্যোগ। দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, তছনছ হয়ে যাচ্ছে চিরন্তন মূল্যবোধ, আনন্দ গ্রাস করে নিচ্ছে আতঙ্ক, কোথাও কোনো নিশ্চয়তা নেই, নেই ভারসাম্য। কেউ যেন আর চিনতেই পারছে না কাউকে, সত্তার বদল ঘটছে না কেবল, বদল ঘটছে সত্যেরও। মুখ নেই কোনো, কেবল মুখোশের ছড়াছড়ি। মুখোশ খসলেও অন্য মুখোশের উত্থান। আর ঘটনাক্রম উদ্ভট। বীভৎস। তাই আমিও আর বুঝতে পারি না আমাকে, বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, ‘এ আমি অন্য কেউ’। আমাদের ব্যক্তিক মানসে ও সামষ্টিক চেতনায় যেভাবে ধরা পড়ছে সমকাল, তারই রূপায়ণ লক্ষ করা যাবে এ কবিতার বইয়ে।

তোষামোদ, লুটপাট, গুম, খুন হত্যায় অস্থির চারপাশ দূরবর্তী দৃশ্য নয় কেবল, প্রতারণা, শঠতা, লাম্পট্যের তর্জনী উপর্যুপরি আছড়ে পড়ে সমাজে ও সত্তায়।

দুঃস্বপ্ন দুশ্চিন্তা আর লাগামহীন কল্পনাকে ছুড়ে ফেলে আমাদের যে বাস্তবতা, তা হয়ে উঠেছে পরাবাস্তব। বিন্যাসে সৌন্দর্য নেই, বিকাশে পারম্পর্য নেই, লক্ষ্য নেই কোনো। সততা ও স্বচ্ছতার যেন এতটুকু লেশ নেই কোনোখানে।

কিন্তু আশা তবু উদ্বোধিত হয়, সব প্রতিকূলতাকে নাকচ করে দিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে ওঠে। তাতেই প্রণোদিত মর্তুকাম ক্লান্তপ্রাণ। যেন অলৌকিক মায়ার অঞ্জনমাখা চোখ বহু বর্ণিল সুগন্ধী এক সুরের তরঙ্গে উদ্বেল হয়ে ওঠে। এ কারণেই জীবনের আকর্ষণ শেষাবধি ফুরিয়ে যায় না, তা-ই প্রকৃত তীর্থ হয়ে ওঠে। শিল্পই মানুষকে জীবন-ঘোরগ্রস্ত করে তোলে, সুতরাং কবিতাও। কারণ কবিতা তার স্বকীয় স্বভাবে চারপাশকে শেকড়-বাকড়সহ আত্তীকৃত করে নেয়, বলা চলে আত্মীকৃতও।

মানুষের অন্তর্লোকের লীলালাস্য দুর্মর। জীবনে তার গুরুত্ব কম নয়। প্রেমময় এক জীবন সে প্রত্যাশা করে, সহজে মেলে না তা, সইতে হয় প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণাও। প্রত্যাশা-প্রাপ্তি-প্রত্যাখ্যান মিলেমিশে জীবন হয়ে ওঠে রহস্য ও মাধুর্যে ভরপুর। ‘এ আমি অন্য কেউ’ কবিতার বইটিতে এসবও গুরুত্ব পেয়েছে।

সব মিলিয়ে জীবন জটিল। তাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারা ভালো। প্রতিবাদ থাকবে অন্যায়ের, প্রতিরোধ থাকবে জবরদস্তির, সামাজিক দায় মেটাবার প্রয়াস থাকবে আন্তরিক, বিবেকের দায় মেটাবার চেষ্টা থাকবে আত্যন্তিক। ক্লিষ্ট তো হয়ে ওঠেই, পিষ্টও করে ক্রমাগত নানা প্রথাগত আয়োজন। তবু আমি সহজ করে জীবনটাকে বুঝে নিতে চাই, আমার যা বলার, তা সহজ করেই বলতে চাই। বর্তমান বাস্তবতায় কিছুই সহজ নয় বলে, তার শাব্দিক বিন্যাস স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। কিন্তু এমন এক কাব্যভাষা আমি চাই না, যা সাধারণ পাঠকের সঙ্গে কবিতার দূরত্ব বাড়িয়ে দেবে। আত্মাটাকে ছুঁতে চাই বলে অনর্থক অলংকারে আমি তত আকর্ষণ বোধ করি না, এড়িয়ে চলি তার সংগত সহযোগিতা।

শিল্পের সঙ্গে জীবনের সংযোগ মানুষকে অধিকতর মানবিক করে তোলে। মানুষের সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা অভিব্যক্ত হয় নানাভাবেই, তবে বইয়ের মধ্যে তাকে পাওয়া যায় সহজে। বইমেলা, বিশেষভাবে একুশে বইমেলা, আমাকে প্রবলভাবে টানে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রাজ্ঞজনদের বই যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনই পাওয়া যায় সদ্য তরুণদের স্পর্ধিত উচ্চারণ। তাতে দেশ ও জাতির বর্তমানই কেবল নয়, ভবিষ্যৎ প্রান্তরের অন্তরের স্বভাবের পরিচয়ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মূল্য অনেক। অনেকে তরুণদের এই সৃষ্টির প্রবল প্রবাহকে বাঁকা চোখে দেখেন, কিন্তু কারো কারো মতো আমি খুবই আশান্বিত হয়ে উঠি। কারণ চারপাশের নানা হিংসাত্মক মসৃণ আহ্বানকে উপেক্ষা করে মননশীলতা আর সৃজনশীলতার দিকে এ আকর্ষণ মানবিক বোধের শ্রেষ্ঠত্বকেই ওপরে তুলে ধরে।

অমর একুশে বইমেলা এখন আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘ এক জাতীয় মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সারা দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ তো বটেই, ছুটে আসেন প্রবাসীরাও। আর আসেন পৃথিবীর নানা প্রান্তের বইপ্রিয় বহু বিদেশিও। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই মেলা বাংলাদেশকে নতুনভাবে অধিষ্ঠিত করে এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে।

আমার এবারের কবিতার বই ‘এ আমি অন্য কেউ’ প্রকাশিত হয়েছে অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ।


মন্তব্য