kalerkantho


প্রিয়জনকে বই উপহার দিন

নওশাদ জামিল   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রিয়জনকে বই উপহার দিন

উপহার নানা রকমই হয়। প্রিয়জনকে ভালোবেসে উপহার দেওয়ার চলটা যেমন প্রাচীন তেমনি এর মর্মার্থ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা শুধু নিছক উপহার নয়, প্রীতি ও ভালোবাসারও স্মারক বটে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে প্রিয়জনকে বই উপহার দেয় অনেকেই। কেননা বই হচ্ছে সেরা উপহার। জন্মদিনে, বিশেষ দিনে, বিশেষ ক্ষণে যারা প্রিয়জনকে বই উপহার দিতে চায়, তাদের অনেকেই গ্রন্থমেলায় ঘুরে ঘুরে কিনছে নতুন বই। প্রকাশকরাও আহ্বান জানালেন এই বলে, বইমেলায় এসে শুধু সেলফি তোলা নয়, বই কিনুন, বই পড়ুন। প্রিয়জনকে বই উপহার দিন।

চমত্কার একটি বই যেমন হতে পারে দারুণ উপহার তেমনি বই পাল্টে দিতে পারে মানুষের মনোজগৎ। কেননা বই মানুষের মনকে সুন্দর করে, সমৃদ্ধ করে। মানুষের জীবন, সমাজ-রাষ্ট্রকে পাল্টে দিতে সাহায্য করে।

বই পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তার মনকে উন্নত ও সুন্দরের পথে নিয়ে যেতে পারে। বই পড়া এবং বই উপহার দেওয়াটাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহসান উদ্দিন খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে বই হচ্ছে সেরা উপহার। আমার আত্মীয়স্বজন, বাসার ছোট-বড় সবার জন্যই চেষ্টা করি বই কিনতে। অন্য কিছু উপহার দেওয়ার চেয়ে আমার কাছে বই উপহার দেওয়াটাকেই বেশি সুন্দর ও স্মার্ট মনে হয়। ’

গতকাল রবিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা যায়, বই কেনাটাই যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য, তারা মেলায় এসেছিল দিনের প্রথম ভাগে। নিরিবিলি পরিবেশে স্বস্তির সঙ্গে স্টলে স্টলে ঘুরে যাচাই-বাছাই করে বই কিনেছে।

বাংলা প্রকাশের সামনে গতকাল বিকেলে দেখা হয় কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবাই শুধু নতুন বই খোঁজে। নতুন বই মানে কী? আমি মনে করি, যে বইটি পড়া হয়নি, সেটিও নতুন বই। বহু আগে প্রকাশিত বইটিও নতুন, যদি তা পড়া না হয়। শুধু এ বছরের প্রকাশিত বই নয়, অন্যান্য সময়ের বইও কেনা উচিত, পড়া উচিত বলে মনে করি। ’

রয়ে গেছে কিছু অব্যবস্থাপনা : পাঁচ দিন পার করলেও গ্রন্থমেলায় রয়ে গেছে কিছু অব্যবস্থাপনা। মেলার দুই প্রবেশ তোরণ টিএসসি ও দোয়েল চত্বরে ডিজিটাল স্ক্রিন লাগানোর কথা। কিন্তু মেলার পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও সে স্ক্রিন নজরে আসেনি। মেলার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, হেঁটে চলার পথটিতে যে ইট বিছানো হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। অনেক প্রকাশকই নিজ খরচে ইট বসিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করে নিয়েছেন।

উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম বলেন, এবারের মেলার স্টল বিন্যাসে কিছুটা সমস্যা থাকলেও অন্যান্যবারের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে নান্দনিকতার দিক থেকে এবারের মেলা পুরোপুরি ব্যর্থ। এত বড় পরিসরে মেলা হচ্ছে, যাতে পাঠকরা ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। তাদের বসার ব্যবস্থাও নেই। এসব ত্রুটি দ্রুত মিটিয়ে ফেললে এবারের মেলা আরো সুন্দর হবে।

জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে মেলার ব্যবস্থাপনা সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিরাপদ ইভেন্টসের সঙ্গে এ ব্যাপারে সভা করেছি। আশা করছি কয়েক দিনে মধ্যেই এ বিষয়গুলোর সুরাহা হবে। ’

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চটি এবার আমরা প্রথমবারের মতো করছি। আমরা বলেছি, মঞ্চে লেখকসহ তিনজন উঠবেন। বাকিরা নিচে থাকবেন। কিন্তু সবার মাথায় নজরুল মঞ্চটি থাকায় এ বিষয়টি সবাই ভুলে যাচ্ছেন। আর বসার স্থানের বিষয়ে বলতে হয়, আমরা বড় আকারের ছাতি দিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসার ব্যবস্থা করলেও চেয়ারগুলো ঠিক জায়গায় থাকছে না। আমরা এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে দেখছি। ’

মোড়ক উন্মোচন : গতকাল মেলায় শহীদকন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরীর ‘এ লড়াই অনিবার্য ছিল’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিলেটের গণহত্যা নিয়ে ছড়াকার লূত্ফর রহমানের ‘লাল সবুজের ছড়া’র মোড়ক উন্মোচন করেন ছড়াকার সিরাজুল ফরিদ।

মেলায় আসা নতুন চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি পত্রস্থ হলো।

যেন ভুলে না যাই : প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক কামাল লোহানীর নিবন্ধ গ্রন্থ। বইটিতে লেখক ইতিহাসের নির্মাতা গুণীদের স্মৃতিচারণা ও তাঁদের জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন। যাঁরা প্রাতঃস্মরণীয় সবার কাছে, তাঁদের মধ্যে বরেণ্য রাজনৈতিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের ছেড়ে গেছেন, তাঁদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধাঞ্জলি। বইটি প্রকাশ করেছে দেশ পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৪৫০ টাকা।  

শেষ চিঠি :  হুমায়ূন-জননী আয়েশা ফয়েজের লেখা। বইটি আসলে প্রয়াত পুত্রকে লেখা মায়ের চিঠি, তাঁর হাহাকার! সেই পুত্র আর মা কেউ আর এখন এই ভুবনে নেই। বইটি শুধু হুমায়ূন আহমেদ নন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল নন, তাঁদের গোটা পরিবারের নানা অজানা কথা উঠে এসেছে আয়েশা ফয়েজের মর্মস্পর্শী ভাষায়। বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। প্রচ্ছদ করেছেন আহসান হাবীব। দাম ১৬০ টাকা।

ভালোবাসি, ভালোবাসি : কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের উপন্যাস। লেখক তাঁর জাদুকরী ভাষায় প্রেম ও যাপিতজীবনের অন্যতর এক আখ্যান বর্ণনা করেছেন। প্রেম-ভালোবাসা শুধু মানুষের জীবনের শাশ্বত সত্য নয়, তার গভীরে লুকিয়ে জীবনেরই সারাৎসার। বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৬৫০ টাকা।

হুমায়ূন সঙ্গীত : নদীর নামটি ময়ূরাক্ষী : প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের গান নিয়ে বইটির লেখক তাঁর সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন। হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস রচনার পাশাপাশি গান লিখেছেন প্রচুর। তাঁর বহু গান মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর সহধর্মিণী শাওন সেসব গান সংগ্রহ করেছেন, লিখেছেন গানগুলো রচনার প্রেক্ষাপট এবং নানা অজানা কথা। বইটি প্রকাশ করেছে কাকলী প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৩০০ টাকা।

অন্যান্য নতুন বই : মেলার তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার পঞ্চম দিনে ৮৭টি নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে। পার্ল পাবলিকেশন্স এনেছে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’। এটি ইতিহাসভিত্তিক দীর্ঘ উপন্যাস। তাতে উঠে এসেছে দেশভাগের জটিল অঙ্ক, কুটিল রাজনীতির প্যাঁচ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আর শোষিত পূর্ব বাংলার বঞ্চিত হওয়ার নেপথ্য কাহিনি। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ৫০০ টাকা।

এ ছাড়া অন্যপ্রকাশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘রচনাবলী নয়’, সময় থেকে প্রকাশিত মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের থিয়েটার ও নাটক’, উৎস থেকে সাহাদাত পারভেজের ‘গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ ইত্যাদি।  

মূল মঞ্চের আয়োজন : গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আহসান হাবীব জন্মশতবর্ষ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি তুষার দাশ। আলোচনায় অংশ নেন ড. অনু হোসেন ও ড. তারেক রেজা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক জুলফিকার মতিন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সালমা আকবর, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, লাইসা আহমদ লিসা ও অণিমা রায়।


মন্তব্য