kalerkantho


জামায়াত-যুবলীগের আশ্রয়ে রোহিঙ্গারা

আরিফুর রহমান, ঢাকা ও তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জামায়াত-যুবলীগের আশ্রয়ে রোহিঙ্গারা

এক মাস আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গা আমিনা খাতুন পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজার সাগরপারের মোসতাকপাড়ার জামায়াত নেতা সৈয়দ আলমের ঘরে। আর এ জন্য মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে সৈয়দ আলমকে।

আরেক রোহিঙ্গা মিনু আরা তাঁর স্বামী জুবায়েরসহ পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে ভাড়ায় উঠেছেন কামাল বহদ্দারের ঘরে। একই এলাকায় সৈকতের বালুচরে বসতি গড়ে তুলেছেন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা আইয়ুব। কক্সবাজার সাগরপারের সৈকতের ঝাউবীথির বালিয়াড়ি দখল করে এ রকম শত শত বসতি গড়ে তুলেছে রোহিঙ্গারা। আর এসব বসতি গড়ে তুলতে তাদের সহযোগিতা করছেন জামায়াত ও যুবলীগের নেতারা। বালিয়াড়িতে আবাসিক প্লট করে বিক্রি চলছে দেদার। আর এসব প্লট নগদ টাকায় কিনে সেখানে বসতি গড়ে তুলছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আসা রোহিঙ্গারা।

শনিবার সরেজমিনে সাগরপারের নাজিরারটেক এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জামায়াতের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সরকারি জমি দখল করে টাকা খেয়ে সেখানে রোহিঙ্গাদের থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে। বন বিভাগের কর্মচারী না হয়েও ‘বনকর্মী’ পরিচয় দিয়ে সাগরপারের একরে একর বালিয়াড়ি জবরদখল করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ধরা পড়েছে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, যুবলীগের কয়েকজন নেতা সরকারি বালিয়াড়ি দখল করছেন।

সাগরপারের যে বালিয়াড়িতে ঝাউগাছের বনায়ন করা হয়েছে, সেটি এখন যুবলীগ নেতাদের দখলে। সেই জমিও দখল করে সেখানে প্লট নির্মাণ করে বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবির) কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও গত অক্টোবর থেকে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে। সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে নতুন করে আসা ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বন বিভাগ থেকে গত সপ্তাহে সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়েছে, মিয়ানমারে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে নতুন করে বাংলাদেশে ঢোকা রোহিঙ্গারা বন বিভাগের বিভিন্ন স্থানে জমি দখল করে সেখানে বসবাস শুরু করেছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য অবৈধভাবে বনের গাছ কেটে বিক্রি করছে তারা। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা নানা ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে। বন বিভাগ মনে করে, রোহিঙ্গাদের এ সব কর্মকাণ্ড এখনই কঠোর হাতে দমন করতে না পারলে ভবিষ্যতে বনভূমি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে গত মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করছে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা। এর সঙ্গে স্থানীয় বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। বন বিভাগের যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেশ কয়েকবার বন বিভাগকে অনুরোধ জানানো হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে না পারলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ ও এর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে বলে ওই গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কর্মকর্তারা গত বছর রোহিঙ্গাশুমারির কাজ শেষ করে এখন গণনার কাজ করছেন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কত, যখন এই সংখ্যা চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত বিবিএসের কর্মকর্তারা, তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাদের নির্দেশনা দিয়ে বলা হয় যে আগের গণনা বন্ধ করে নতুন করে কতসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, তার শুমারি করা দরকার। বিবিএস কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের শুমারির কাজ যখন শেষ পর্যায়ে, ঠিক তখনই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাদের নতুন করে শুমারি করতে বলা হয়েছে। এতে করে তাদের আগের সব পরিশ্রম বৃথা গেছে। এখন নতুন করে শুমারি করার পরিকল্পনা নিচ্ছে বিবিএস।

জানতে চাইলে রোহিঙ্গাশুমারির প্রকল্প পরিচালক আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আমাদের নতুন করে রোহিঙ্গাদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। আমরা সে আলোকে প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। ’ চলতি মাস থেকে পুনরায় রোহিঙ্গাশুমারির কাজ শুরু করা হবে বলে জানান আলমগীর হোসেন। পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্রসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এমনিতেই আশি ও নব্বইয়ের দশকে আসা রোহিঙ্গাদের গতিবিধির দিকে চোখ রাখা ও নজরদারি করতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা এরই মধ্যে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বনের জমি দখল করতে শুরু করেছে। এতে করে তাঁদের কাজের চাপ বহুগুণ বেড়েছে।

কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বালিয়াড়ি দখল করা ব্যক্তিদের নামে পাড়ার নামকরণও করে ফেলা হয়েছে। বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে দখলবাজির হোতা ছিলেন আবুল কাশেম বাসিন্যা নামের একজন জামায়াত সমর্থক। তাঁর জবরদখল করা বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে গড়ে উঠেছে অন্ততপক্ষে পাঁচ শতাধিক বসতি। বালিয়াড়ির এই অংশের নাম হয়েছে ‘বাসিন্যাপাড়া। ’ বনের জমি দখলে আরেকজনের নাম উঠে এসেছে; যার নাম মোসতাক আহমদ। স্থানীয় যুবলীগ নেতা মোসতাক আহমদ বন বিভাগের ‘ওয়াচার’ ছিলেন। তিনি বন বিভাগীয় কর্মী দাবি করে দখল করে নিয়েছেন সাগরের একদম পানি ছোঁয়া একরে একর ঝাউবীথির বালিয়াড়ি। এই বালিয়াড়ি প্লট আকারে বিক্রিও করেছেন। বালিয়াড়ির এই অংশের নাম হয়েছে ‘মোসতাকপাড়া। ’

জানতে চাইলে কক্সবাজার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ সভাপতি মোসতাক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এবং বাবুল বন বিভাগের ওয়াচার ছিলাম। মাসিক এক হাজার পঞ্চাশ টাকা করে আমাদের ভাতা দেওয়া হতো বন বিভাগ থেকে। ঝাউবীথি রক্ষণাবেক্ষণ করাই আমাদের দায়িত্ব ছিল। এক বছর ধরে ওয়াচার হিসেবে আমরা আর নেই। ’ তিনি বলেন, ‘আমি একটি বাসা করেছিলাম নাজিরারটেক বালুচরে। তখন কোনো বসতি ছিল না। এখন সেখানে শত শত বসতি গড়ে উঠেছে। এ কারণে পাড়ার নামটি হয়েছে আমার নামে। ’ মোসতাক আহমদ বলেন, ‘বালিয়াড়ি বিক্রির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার প্রতিপক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ’ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, মোসতাক পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি।

এদিকে বালিয়াড়িসহ ঝাউবীথি দখলের ঘটনায় বন বিভাগের কথিত ওয়াচার মোসতাক আহমদকে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার বন বিভাগীয় বন প্রহরী আবু শামার বিরুদ্ধে। তবে আবু শামা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি স্থানীয় বাসিন্দা। তাই আমার শত্রুরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এসব অপপ্রচার করছে। ’ সাগরপারের কুতুবদিয়াপাড়ার এরশাদ নামের আরেক যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধেও বালিয়াড়ি দখলের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বাবুল নামের একজন বন বিভাগের ওয়াচারের নাম দিয়ে বিপুল পরিমাণ বালিয়াড়ি দখল করেছেন বলে এলাকার বাসিন্দারা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে। মোসতাক আহমদ জানিয়েছেন, এরশাদও যুবলীগের নেতা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যুবলীগ নেতা মোসতাক, আবু শামা ও এরশাদের নাম। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও প্লট বাণিজ্যের সঙ্গে মোসতাক, আবু শামা ও এরশাদ জড়িত। টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জমি দখল করে দিচ্ছেন এঁরা। একাধিকবার তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগকে অনুরোধ জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক আবদুল লতিফ মিয়া প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, মিয়ানমার থেকে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়া রেঞ্জে সরকারি সংরক্ষিত বনে অস্থায়ী ঘরবাড়ি বানানো শুরু করেছে। বন বিভাগ থেকে সেখানে উচ্ছেদ করতে গেলে রোহিঙ্গারা সংঘবদ্ধ হয়ে বন বিভাগের কর্মীদের ওপর আক্রমণ করে।   প্রতিবেদনে আবদুল লতিফ বলেন, উখিয়ারঘাট বিটের সংরক্ষিত বনভূমি অনেকটা দখল করে সেখানে রোহিঙ্গারা বসতি গড়ে তুলেছে। অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলা রোহিঙ্গাদের বনভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে না পারলে ভূমিখেকোদের ছত্রচ্ছায়ায় কক্সবাজারের পুরো বনভূমি দখল হয়ে যাবে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলী কবীর প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে পাঠানো আলাদা একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, স্থানীয় কিছু ভূমিদস্যু রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের বসতি গড়ে তুলতে মদদ দিচ্ছে। সংরক্ষিত বনভূমি থেকে জবরদখল উচ্ছেদের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে তিনি প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে অনুরোধ জানান। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

শনিবার কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জামায়াত নেতা সৈয়দ আলম যুবলীগ নেতা মোসতাককে সামনে দিয়ে সাগরপারের বালিয়াড়ির প্লট বিক্রি করছেন। প্রতিটি প্লটের জমি বিক্রি হচ্ছে শতক ৫-১০ হাজার টাকা করে। সেখানে ভাড়াটিয়া হিসেবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারী আমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি মাত্র এসেছি তাই নগদ টাকা নেই। আয় রোজগার করছি। টাকা জমিয়েই একখণ্ড বালিয়াড়ি কিনে ঘর করব। ’ চরের মোসতাকপাড়ার উত্তরে দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের। কাদেরও বালিয়াড়ির প্লট বিক্রিতে জড়িত। এভাবে জামায়াত-যুবলীগ সিন্ডিকেট করে খাসজমি বিক্রি করছে রোহিঙ্গাদের কাছে।


মন্তব্য