kalerkantho


নীতিমালা নয়,আইনই পারে সুরক্ষা দিতে

রেজাউল করিম   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নীতিমালা নয়,আইনই পারে সুরক্ষা দিতে

রাজধানীসহ দেশের সব নগর ও শহর এলাকায় বেশির ভাগ পরিবার গৃহস্থালি কাজের ক্ষেত্রে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। অথচ বেশির ভাগ পরিবার গৃহকর্মীদের সুরক্ষার চেয়ে নির্যাতনই করে বেশি। সরকারের পক্ষ থেকে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। কেননা নীতিমালার মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে না নির্যাতিত গৃহকর্মীরা। আইনি পদক্ষেপ নিতে এই নীতিমালাকেই আইনে রূপ দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলে গৃহকর্মীরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সেসব নির্যাতনের রূপ ভয়াবহ। মানুষ হিসেবে একজন গৃহকর্মীর যে মানবাধিকার সেগুলোও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাদের পাওনা, নিয়োগ, চাকরিচ্যুত হয় গৃহকর্তা-কর্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী।

এলিনা খান বলেন, সরকার ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

কিন্তু ওই নীতিমালা এখন শুধু কাগজে কলমেই আছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে প্রশাসনকে নিয়ে তদারকি সেল গঠন করার কথা। সেই সেল হয়েছে কি না বা তারা কোনো কাজ করছে কি না, নজরে পড়ে না। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর প্রমাণ দেয়, ওই নীতিমালা নামমাত্র।

উল্লেখ্য, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় করা নীতিমালা অনুযায়ী সারা দেশে মনিটরিং সেল গঠন করতে সম্প্রতি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে এলিনা খান বলেন, নীতিমালা দিয়ে গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়। দরকার একটি আইনের। সরকার গৃহকর্মী সুরক্ষায় যে নীতিমালা করেছে, এটিকে একটু পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে আইনে রপান্তরিত করলেই হবে। আইনে শাস্তির বিধান করা যায়, কিন্তু নীতিমালায় তা করা যায় না। আইন করতে হবে, তা সবার মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং আইন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

আইএলও ও ইউনিসেফের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে এখন প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশ মেয়েশিশু বা নারী। আইএলও বলেছে, এখন যে পরিমাণ গৃহকর্মী কাজ করছে, আগামী ১০ বছর পর এই সংখ্যাটা আরো বেড়ে প্রায় ২৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

এলিনা খান বলেন, গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬’ এর আওতাবহির্ভূত রাখায় বিপুলসংখ্যক কর্মীর মানবিক অধিকার, শোভন কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ ছাড়া শারীরিক-মানসিক হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে গৃহকর্মীরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সর্বশেষ জরিপে বলা হয়, নিয়োগ পাওয়া গৃহকর্মীদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১৭ শতাংশ, অনিরাপদ জীবন যাপন করে ৪০ শতাংশ, মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার প্রায় ৭০ শতাংশ। আর প্রায় ৭০ শতাংশ গৃহকর্মী পড়াশোনার কোনো সুযোগ পায় না, বিনোদন বঞ্চিত প্রায় ৬০ শতাংশ গৃহকর্মী। এ ছাড়া প্রায় ৮৪ শতাংশ গৃহকর্মীর সঙ্গে গালাগাল দিয়ে কথা বলে গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা, ৫০ শতাংশ কর্মী প্রতিনিয়ত নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার। আর ৪৭ শতাংশ যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ভয়ে থাকে, ৬৪ শতাংশ গৃহকর্মীকে তার শারীরিক সক্ষমতার বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

আইএলও ও ইউনিসেফের জরিপে দেখা গেছে, গৃহকর্মীদের ২০ শতাংশ তাদের নিয়োগদাতার বাড়ির বৈঠকখানায় রাত্রী যাপন করে, ৩৩.৩ শতাংশ রান্না ঘরে, ১৬.৬৭ শতাংশ বাড়ির বারান্দায়, ৩.৩৩ শতাংশ বাড়ির স্টোর রুমে থাকে। আর শোবার ঘরে রাত্রী যাপনের সুযোগ পায় ২০.৬৭ শতাংশ। পৃথক থাকার ঘরে রাত্রী যাপনের সুযোগ পায় মাত্র ৬.৬৭ শতাংশ।

গৃহকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব নাজমা ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো ক্ষেত্র তৈরি হবে। তবে গৃহকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার। কারণ অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোনো গৃহকর্মী নীতিমালা অনুযায়ী আইনের আশ্রয় নিতে পারে না। আবার শ্রম আইনেও গৃহকর্মীদের জন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। ফলে একটি আইন করা বেশ জরুরি। তিনি জানান, আইনের খসড়া প্রণয়নে গৃহকর্মী অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক কাজ করছে।

২০১৪ সালে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ গৃহকর্মীদের মানবেতর জীবনযাপন নিয়ে ‘ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স : ডিভ্যলুয়েশন অ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন’ শীর্ষক গবেষণা করে। এতে উল্লেখ করা হয়, ৫৭.৫ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী দৈনিক ৯ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। ১২ শতাংশ শিশু গৃহকর্মীর কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। একজন শিশু গৃহকর্মী মাসে গড়ে এক হাজার ১৮৫ টাকা মজুরি পায়। ২৮.৭ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী নিয়মিত মজুরি পায় না। দেশের সাতটি প্রশাসনিক বিভাগের সাতটি জেলায় জরিপের ভিত্তিতে এ গবেষণা করা হয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও গৃহকর্মী সুরক্ষায় গঠিত কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলের সদস্য আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী গৃহকর্মীদের সুরক্ষা তদারকির জন্য একটি কেন্দ্রীয় সেলসহ সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে একটি করে সেল গঠন করার কথা। অল্প কিছুদিন আগে কেন্দ্রীয় সেলটি গঠিত হয়েছে। এখন এই সেল নীতিমালাটি নিয়ে প্রচারের কাজ করে যাচ্ছে। এই সেল এখনো পুরোপুরি তদারকির কাজ শুরু করেনি। চলতি মাস থেকে শুরু করার কথা রয়েছে বলে তিনি জানান।


মন্তব্য