kalerkantho


প্রযুক্তিতে হাত পাকিয়ে মাঠে জেএমবি জঙ্গিরা

এস এম আজাদ   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রযুক্তিতে হাত পাকিয়ে মাঠে জেএমবি জঙ্গিরা

নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পুরনো সদস্যরা তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি) বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জেএমবির নতুন ধারার যেসব জঙ্গি আইটিতে দক্ষ তাদের কাছে প্রশিক্ষণও নিয়েছে তারা।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে উইকার, থ্রিমা, সিওর, স্পট, টেলিগ্রামসহ কয়েকটি অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ শিখছে তারা। অদক্ষ জেএমবি সদস্যদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে মোহাম্মদ আশফাক-ই-আজম ওরফে আপেল। জেএমবির ‘সারোয়ার-তামিম’ গ্রুপের আইটি শাখার প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর আশফাক এ দায়িত্ব পায়। গুলশান হামলাসহ বিভিন্ন নাশকতায় সক্রিয় নতুন ধারার জেএমবির সঙ্গে আশফাকের যোগাযোগ ছিল। তাদের দলটি পুরনো জেএমবি থেকে উঠে আসা নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছে। বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার ছাড়াও অস্ত্র চালানায় পারদর্শী তারা। গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকা থেকে আশফাকসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, গত ১৭ জানুয়ারি পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট থেকে পুরনো জেএমবির এহসার সদস্য মোকসেদুর রহমান মোমিনকে গ্রেপ্তারের পরই আইটি বিশেষজ্ঞ দলটির বিষয়ে তথ্য পায় র‌্যাব। গ্রেপ্তার চারজন নির্মাণ শ্রমিক পরিচয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিল।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে মামলার তদন্তভার পেয়েছেন তাঁরা। পাঁচ জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করা হবে। এ জন্য তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন তদন্তকারীরা।

র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশফাক অ্যাপস পরিচালনাসহ আইটি বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ। বাকিরাও এসব শিখেছে। তারা অস্ত্র চালানারও প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পুরনো জেএমবি সদস্যরা একসময় নিষ্ক্রিয় ছিল। ২০১১-১২ সালের পর তারা নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে তারা আইটি প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার আসামিদের ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। জানা গেছে, তারা নতুন ধারার জেএমবির জঙ্গি। মামলার তদন্ত ও রিমান্ডের আদেশ পেলে এ ব্যাপারে খতিয়ে দেখা হবে। ’

র‌্যাব-১০-এর আরেকটি সূত্র জানায়, গত ১৭ জানুয়ারি ওয়াইজঘাট থেকে অস্ত্র, জিহাদি বইসহ মোমিনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের সঙ্গে সরোয়ার-তামিম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা পায় র‌্যাব। মোমিনের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ী। গত ১ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার একটি ভবন থেকে মোহাম্মদ আশফাক-ই-আজম ওরফে আপেল ওরফে আব্দুল্লাহ, মাহবুবুর রহমান ওরফে রমি, শাহিনুজ্জামান ওরফে শাওন ও আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন, ২১টি গুলি, সাতটি ছুরি, পৌনে তিন কেজি বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক পাউডার, পাঁচটি পাওয়ার জেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করে র‌্যাব। এরই মধ্যে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে র‌্যাবকে। মোমিন গ্রেপ্তারের মামলাও তদন্ত করছে র‌্যাব। পাঁচ জঙ্গিকে একই কারণে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছেন র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা। তবে এখনো রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করা হয়নি। পাঁচ আসামি এখন জেলহাজতে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের ৯ আগস্ট জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের আইটি শাখার প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত গ্রেপ্তার হলে তার স্থলাভিষিক্ত হয় আশফাক। সে ধানমণ্ডির ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে ২০১২ সালে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে। এরপর গুলশান, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন আইটি ফার্মে প্রগ্রামার হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে সে। ২০১১ সালে রংপুরের হারাগাছায় একটি মাহফিলে জেএমবি নেতা কামাল ও সাকিব মাস্টারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের মাধ্যমেই তার জেএমবিতে যোগ দেওয়া। এর আগে চট্টগ্রামে অস্ত্র চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছে আশফাক।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গুলশান হামলার পর নতুন ধারার জেএমবি সদস্য সাকিব ও কামালের নাম উঠে আসে। তারা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জঙ্গি প্রশিক্ষক। এখনকার জেএমবির শীর্ষ নেতা সারোয়ার জাহানের সঙ্গেও আশফাকের যোগাযোগ ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আশফাক দাবি করেছে, সে সারোয়ারকে চিনত মানিক নামে। সে বিভিন্ন সময় জঙ্গি সংগঠনের জন্য ওয়েবসাইট ডিজাইন করা ছাড়াও আগে সিফাতের সঙ্গে আৎ-তামকিন জঙ্গি সাইটের কো-অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। একই সঙ্গে জেএমবির জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ করত। এভাবে জেএমবির জন্য তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করে আশফাক।

সূত্র মতে, আশফাক শীর্ষ নেতাদের উইকার, থ্রিমা, সিওর, স্পট, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন গোপন এনক্রিপটেড অ্যাপস চালানোর প্রশিক্ষণ দিত। পুরনো জেএমবি থেকে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠা জঙ্গিরা আইটিতে দক্ষ নয়। তাদেরও প্রশিক্ষণ দিত আশফাক। উল্লিখিত অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ ও বার্তা প্রদান করা হলে তা সহজে শনাক্ত করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন নিজেদের যোগাযোগ ও বার্তা আদান-প্রদানে এসব অ্যাপস ব্যবহার করে। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার সময়ও জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে ‘উইকার’ অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছিল। সেখানকার নৃশংসতার ছবি বাইরে পাঠিয়েছিল তারা। অ্যাপসটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

র‌্যাব আরো জানায়, আশফাকের তিন সহযোগীর মধ্যে মাহবুবুর রহমান ওরফে রমি ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করে। ২০১৫ সালে বগুড়ার একটি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করা অবস্থায় আশফাকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আশফাক তাকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। রমির দায়িত্ব ছিল বগুড়া অঞ্চলে জেএমবির গোপন পার্সেলগুলো যথাযথ হাতে পৌঁছানো। সে পুরনো জেএমবির সদস্য ছিল। আশফাকের হাত ধরে সে সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগ দেয়। চাকরি ছেড়ে সে আশফাকের সঙ্গে চট্টগ্রামে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।

গ্রেপ্তার শাহিনুজ্জামান শাওন ২০১৪ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করে। গত বছরের ২১ জুলাই র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক কমান্ডার মাহমুদুল হাসান। তার মাধ্যমেই শাওন জেএমবিতে যোগ দেয়। মাহমুদুলের তত্ত্বাবধানে যে পাঁচ-ছয়জন ঢাকার মিরপুরে প্রশিক্ষণ নেয়, শাওন তাদেরই একজন। ২০১৫ সালের শেষের দিকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণের সময় তার পায়ে গুলি লাগে।

গ্রেপ্তার আশরাফ আলী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদে জড়ায়। ২০১৪ সালে সাভারে সে পোশাক কারখানায় কাজ করত। ২০১৫ সালে সেও চট্টগ্রামে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেয়।


মন্তব্য