kalerkantho


স্কুলের সভাপতি হতে চান আ. লীগ নেতা

সই নেওয়ার চাপে অজ্ঞান শিক্ষিকা!

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সই নেওয়ার চাপে অজ্ঞান শিক্ষিকা!

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে জটিলতায় এক শিক্ষিকার সই নিতে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া গেছে। মানসিক চাপে অজ্ঞান হয়ে পড়ায় দুই দফা হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন নাজমা বেগম নামের ওই শিক্ষিকা।

এ ঘটনায় ওই বিদ্যালয়ের কয়েক শ শিক্ষার্থী গত বৃহস্পতিবার ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদ বাগাতে মরিয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও অভিভাবক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ওই শিক্ষিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ওই শিক্ষিকা গত বৃহস্পতিবার ছুটি চেয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদনও করেছেন। এর আগে এসব বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষিকা নাজমা বেগম গত মঙ্গলবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেনের কাছে যান। ওই সময় নাজমার স্বামী আব্দুল মান্নান তাঁর সঙ্গে ছিলেন। কথাবার্তা শেষে দুজন সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন বাজিতপুর বাজারের এবি ছিদ্দিক টাওয়ার থেকে বের হওয়ার পর সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুর নেতৃত্বে কয়েকজন মিলে তাঁদের ঘিরে ধরে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে পিরিজপুরে শিক্ষিকা নাজমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল কমিটির বর্তমান সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক সেখানে অবস্থান করছেন। তাঁদের কাছে নাজমা বেগম আওয়ামী লীগ নেতাসহ অন্যদের দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। এর অডিও রেকর্ড কালের কণ্ঠ’র কাছেও আছে।

তবে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে নাজমা বেগম ভাবলেশহীনভাবে বলেন,‘এসব লিখে আর কী হবে?’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মো.আফজাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, শিক্ষিকার ওপর আওয়ামী লীগ নেতার চাপ সৃষ্টি করার ঘটনাটি ওই শিক্ষিকার আগে তাঁকে কেউ জানায়নি। এমন কিছু ঘটে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পিরিজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ১৩ জানুয়ারি স্কুল কমিটির নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু, একজন নারীসহ মোট পাঁচজন অভিভাবক সদস্য নির্বাচিত হন। শিক্ষিকা নাজমা বেগম ও অন্য দুজন শিক্ষক মনোনীত হন ‘শিক্ষক প্রতিনিধি’। একজন দাতা সদস্যসহ কমিটির মোট সদস্য দাঁড়ায় ৯ জনে। তাঁদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার জন্য চেষ্টা-তদবির শুরু করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনের এক সপ্তাহের মধ্যে সভাপতি মনোনয়নের বিধান থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ১৭ জানুয়ারি নবনির্বাচিত কমিটির সভা ডাকে। অভিযোগ ওঠে, সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুকে সভাপতি করতে ৯ সদস্যের মধ্যে চারজনের স্বাক্ষর না নিয়ে গোপনে ওই সভা ডাকা হয়। এ চারজনের মধ্যে রয়েছেন দুই অভিভাবক সদস্য মো. জসিমউদ্দিন নূরু ও জুনা আক্তার এবং দুই শিক্ষক প্রতিনিধি নাজমা বেগম ও মাজহারুল ইসলাম। পরে এ চারজনই শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগে জানান, তাঁদের নোটিশ না করেই গোপনে কমিটির অন্য পাঁচ সদস্য বাচ্চুকে সভাপতি মনোনীত করে বোর্ডে চিঠি পাঠান।

এ নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। ১৯ জানুয়ারি দুই অভিভাবক সদস্য বাদী হয়ে সভাপতির মনোনয়নকে অবৈধ ঘোষণা চেয়ে বাজিতপুর সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। আদালত বিবাদীদের কাছে নোটিশ পাঠান। এ মামলার অভিযোগ খণ্ডন করতে সভাপতিপ্রত্যাশীসহ তাঁর লোকজন অভিযোগকারীদের একজন শিক্ষক প্রতিনিধি নাজমা বেগমের সই আদায়ের চেষ্টা করেন।

স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক, অভিভাবক ও অভিভাবক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার এমপির সঙ্গে দেখা করার পর নাজমা বেগমকে ঘিরে ধরার সময় বাচ্চুর সঙ্গে আরেক অভিভাবক সদস্য বিল্লাল মিয়া এবং আব্দুর রউফ ছাড়াও অপরিচিত দুই ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরা নাজমার কাছ থেকে জোর করে সই আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। মানসিক চাপ সইতে না পেরে নাজমা বেগম একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। নাজমার স্বামী অসুস্থ স্ত্রীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলিশ রঞ্জন সরকার জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার পর ওই শিক্ষিকাকে ভর্তি করিয়ে স্যালাইন দেওয়া হয়। পরে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ওই দিনই বিকেলে হাসপাতাল থেকে নাজমাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। নাজমার স্বামী আব্দুল মান্নান জানান, বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী ফের অসুস্থ বোধ করলে পরদিন বুধবার তাঁকে জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

স্কুল কমিটির বর্তমান সভাপতি ও সাবেক শিক্ষক মো. নূরুল্লাহ শিক্ষিকা নাজমা বেগমের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও ঘোরতর অন্যায় বলে মনে করেন। তিনি বলেন, দলাদলি ও বিরোধের কারণে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতা ও অভিভাবক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু শিক্ষিকা নাজমা বেগমকে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি ওই শিক্ষিকার সামনে যাননি আর এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।


মন্তব্য