kalerkantho


বিশ্ব ক্যান্সার দিবস আজ

দেশে প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত ৩৩৪ জন

চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতা বিভ্রান্তি, হয়রানি

তৌফিক মারুফ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দেশে প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত ৩৩৪ জন

দেশে প্রতিদিন নতুন করে ৩৩৪ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে ২৫০ জন রোগী।

সেন্টার ফর ক্যান্সার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিসিপিআর) এ তথ্য জানিয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। গতবারের মতো এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আসুন সবাই মিলে ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করি’।

দেশে নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ভয়াবহ চিত্রের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রতা। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এমন অনেক ঘটনাই জানা যাচ্ছে। ভোগান্তির শিকার হয়ে মারা যাওয়া এক রোগীর নাম আব্দুল করিম। গলায় অসহ্য ব্যথার কারণে স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথার ওষুধ খাওয়া শুরু করেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের এই গাড়িচালক। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকায় একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বার ঘুরে একজনের সিরিয়াল জোগাড় করেন।

সেখানে পরীক্ষায় গলায় ক্যান্সারের উপসর্গ ধরা পড়ে আব্দুল করিমের। আরো নিশ্চিত হন আরেক চিকিৎসকের মাধ্যমে। তত দিনে অনেক দিন গড়িয়ে যায়। অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন চিকিৎসক। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় অনেক দিন অপেক্ষায় থেকে ভর্তি হন জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে অস্ত্রোপচারের আগেই মারা যান আব্দুল করিম।

ঘটনাটি জানিয়ে ওই রোগীর এক স্বজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হয়ে মূল চিকিৎসায় যাওয়ার আগেই আমার রোগীর মৃত্যু হলো। তাঁর আসলেই ক্যান্সার হয়েছে কি না, সেটা নিশ্চিত হতেই অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। এরপর যেখানেই গেছি, সেখানেই সিরিয়ালে পড়ে থাকতে হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। ’

আরেক ভুক্তভোগী ময়মনসিংহের মতিউর রহমান। জিহ্বায় ঘা নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। কখনো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কখনো বেসরকারি হাসপাতালে একাধিক ডাক্তারের কাছে দৌড়ানোর পর ধরা পড়ে তাঁর ক্যান্সার। সর্বশেষ ডাক্তার বলেন, এরই মধ্যে ক্যান্সার তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমন বিভ্রান্তি আর ঘোরাঘুরিতে হয়রান হয়ে ওই রোগী এবার চিকিৎসার জন্য ভারতে যাচ্ছেন।

মতিউরের আত্মীয় ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যান্সার নিশ্চিত হতেই রোগীর অবস্থা কাহিল। চিকিৎসা তো দূরের কথা। এমন হলে দেশের চিকিৎসায় আমরা আস্থা রাখব কিভাবে?’ তিনি বলেন, নানা হয়রানি, বিভ্রান্তি, দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ে রোগীর ক্যান্সার আরো বাজে অবস্থায় চলে যায়। ’

ক্যান্সারের চিকিৎসার এই অবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোল্লাহ ওবায়েদুল্লাহ বাকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে দেশে ক্যান্সার রোগীদের বেশির ভাগই বিভিন্ন পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ করে আমাদের কাছে (ক্যান্সারের চিকিৎসক) আসে তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে গিয়ে, যখন আমাদের করার মতো খুব একটা কিছু থাকে না। এর আগে রোগীরা বিভিন্ন বিভাগের ডাক্তারদের কাছেই থাকেন। ওই ডাক্তাররা অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো আমাদের কাছে রোগী রেফার না করে নিজেরাই চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর আরো সর্বনাশ ঘটে। ’

অধ্যাপক ডা. বাকী পরামর্শ দিয়ে বলেন, যেকোনো বিভাগেই হোক না কেন, সেখানকার ডাক্তার যদি প্রাথমিক পর্যায়েই ক্যান্সারের আলামত পেয়ে যান, তখনই তাঁর উচিত হবে ওই রোগীকে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। সেই সঙ্গে রোগীদেরও বহুজনের কাছে না ছুটে অভিজ্ঞ যেকোনো একজন ডাক্তারের চিকিৎসায় থাকাই ভালো। সেই সঙ্গে অবশ্য কোন ডাক্তার দেখাচ্ছেন তাঁর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে সচেতনতার মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যান্সার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়িয়ে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে দেশে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার ও স্বরনালির ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। আর নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার বেশি।

ডা. মোল্লাহ ওবায়েদুল্লাহ বাকী বলেন, শুধু ধূমপান বন্ধ করে ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখগহ্বরের ক্যান্সার, স্বরনালির ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুর ক্যান্সার অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে না দিয়ে, দুয়ের বেশি সন্তান ধারণ না করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে এবং এইচপিভি ভ্যাকসিন নিয়ে বেশির ভাগ জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সিসিপিআরের উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ক্যান্সার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এতে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ক্যান্সার ও ইপিডেমিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন নানা তথ্য তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশে এক লাখ ২২ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ৯১ হাজার জন।

সংবাদ সম্মেলনে সিসিপিআরের নির্বাহী পরিচালক মোসাররত জাহান সৌরভসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে আজ জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে আলোচনা সভা, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও অধ্যাপক ডা. ওবায়েদুল্লাহ-ফেরদৌসী ফাউন্ডেশন ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শোভাযাত্রা, ইউনাইটেড হাসপাতালে গোলটেবিল বৈঠক, অ্যাপোলো হাসপাতালে বিশেষ সেবা, আলোচনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।


মন্তব্য