kalerkantho


নাটোরে ডাক্তার আটক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে

চিকিৎসার নামে রোগীর কিডনি চুরির অভিযোগ

রেজাউল করিম, নাটোর   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চিকিৎসার নামে রোগীর কিডনি চুরির অভিযোগ

নাটোরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী ডাক্তারের বিরুদ্ধে কিডনি চুরির অভিযোগ করেছেন। রোগীর অভিযোগ প্রায় দেড় বছর আগে এ ক্লিনিকেই কিডনি থেকে পাথর অপসারণ করার কথা বলে তাঁর কিডনি খুলে নেওয়া হয়েছে।

তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী সার্জন ডা. এম এ হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড় এলাকার ‘জনসেবা হাসপাতাল’ নামের ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ক্লিনিকের সঙ্গে জড়িতরা পালিয়ে যায়।

রোগীর স্বজনরা জানায়, দেড় বছর আগে সিংড়া উপজেলার ছোট চৌগ্রাম গ্রামের ফজলু বিশ্বাসের স্ত্রী আসমা বেগম পেটের ব্যথা নিয়ে ‘জনসেবা হাসপাতালে’ ভর্তি হন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগীর স্বজনদের জানানো হয় পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে। ২২ হাজার টাকা রফা করে অপারেশনের চুক্তি হয়। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে নিয়ে গিয়ে স্বজনদের জানানো হয় পিত্তথলি নয়, কিডনিতে পাথর হয়েছে। আর এ জন্য অপারেশন করাতে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে দেনদরবার শেষে ৩৫ হাজার টাকায় ওই রোগীর অপারেশন সম্পন্ন করেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী সার্জন ডা. এম এ হান্নান।

রোগী বাড়ি ফিরে যাওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই পেটে ব্যথা অনুভব করেন। স্বজনরা রোগীকে আবার ওই ক্লিনিকে (জনসেবা হাসপাতাল) নিয়ে আসে। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানানো হয়, রোগীর ডান পাশের একটি কিডনি নেই। বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্বজনরা গত কয়েক দিনে রোগীকে আরো কয়েকটি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায়। সব পরীক্ষাতেই রোগীর একটি কিডনি নেই বলে জানানো হয়।

ফজলু বিশ্বাস জানান, কিডনিতে পাথর অপারেশনের পর থেকে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। পেট ব্যথা, শরীর দুর্বল থাকা, পরিশ্রম করতে না পারা, তলপেট ব্যথা ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দেয়। পরে এ ক্লিনিকেই স্ত্রীকে নিয়ে আসেন তিনি। করানো হয় আলট্রাসনোগ্রাম। বলা হয়, রোগীর ডান পাশের একটি কিডনি নেই। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হতে নাটোর শহরের আইডিয়াল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কেয়ার হাসপাতালসহ অন্তত পাঁচটি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু ওই সব ক্লিনিক থেকেও রোগীর ডান পাশের একটি কিডনি নেই বলে জানানো হয়।

ফজলু বিশ্বাস আরো জানান, রোগীকে যে ডাক্তারের কাছে দেখানো হয়েছিল গতকাল জনসেবা হাসপাতালে তিনি আসেন। ডাক্তার রোগীকে দেখেন, সঙ্গে সব রিপোর্টও। তিনি রোগীর স্বজনদের বলেন, ‘রোগীর একটি কিডনি নেই এটা এসব পরীক্ষায় বোঝা যায় না। এ জন্য আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার। তিনি রোগীকে গ্যাসের ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। রোগীর স্বজনরা এ কথা না মেনে হৈচৈ শুরু করে। ক্লিনিকের লোকজন ডাক্তারের পক্ষ নিয়ে রোগী ও রোগীর স্বজনদের হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে খবর পেয়ে পুলিশ আসে ক্লিনিকে। অন্যরা পালিয়ে গেলেও পুলিশ ডা. এম এ হান্নানকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। রোগীর স্বজনরাও থানায় যায়।

আসমা বেগমের ছেলে হাবিব বিশ্বাস বলেন, ‘কয়েকটি ক্লিনিক থেকে আগেও কিডনি চুরির দুটি ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মীমাংসা করা হয়েছে বলেও শুনেছি। ’ পুলিশ তদন্ত করলেই সব পাবে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে কিডনি না থাকার কথাটি স্বীকার করে ডা. এম এ হান্নান বলেন, কিডনি চুরির প্রশ্নই আসে না। কোনো কারণে কিডনি ছোট হয়ে রয়েছে। যার কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ছে না। তবে আইভি নামের একটি পরীক্ষা করানো হলে নিশ্চিত করে বলা যাবে।

নাটোর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমানকে রোগীর উপসর্গ ও অপারেশনের দাগ বিষয়ে অবহিত করেন এ প্রতিবেদক। পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব উপসর্গ রোগীর একটি কিডনি না থাকা বা কিডনিতে সমস্যার লক্ষণ। তবে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাবে না। ’ তিনি বলেন, থানায় মামলা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ওই ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কথা হলে নাটোর সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা জানান, রোগীর স্বজনদের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসককে আটক করা হয়েছে। পরে যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত রাতে থানায় অবস্থান করা রোগীর স্বজনরা জানায়, তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায়, যাতে রোগীকে চিকিৎসা করাতে পারে। নয়তো তারা মামলা করবে।


মন্তব্য