kalerkantho


অভিমানী নদী ও নিসর্গ

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অভিমানী নদী ও নিসর্গ

আনন্দ ও বিষাদে ফুল এবং পাখির গান আমাদের হৃদয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সেতুবন্ধ রচনা করে দিতে বলশালী বান্ধব, সখা-সখীর আসন দখল করতে পারে সুগঠিত অনিমিখে এবং গাছে প্রস্ফুটিত থেকে সজনীর হাত প্রসারিত করে দেয়। আবার পাখিদের আমরা যখন-তখন ছুঁয়ে দেখতে পারি না বলেই কি ওরা গান গেয়ে ও কথা বলে অস্তিত্ব জানান দেয়, সহমর্মিতা ও দাক্ষিণ্য প্রকাশ করে, অথবা অপার করুণা! আবার ফুল হচ্ছে পাখাহীন পাখি, প্রজাপতি হলো পাখাওয়ালা ফুল।

খুব প্রাচীনকাল থেকে দীক্ষায়, প্রেমে, সমরে পুষ্প মানুষের নির্লোভ সহায়। যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের পূর্বপুরুষ যোদ্ধারা পদ্মব্যূহ রচনা করতেন। গোলাপ ও চন্দ্রমল্লিকা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনত জাপানিরা। আবার ফুল ছাড়া মৃত্যুকে আমরা ভয় পাই। আমরা ফুল দিয়ে অর্চনা ও শ্রদ্ধা জানাই। কোথাও কোথাও মানুষ ফুলের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে। ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই প্রিয়জনকে, অনুরাগ প্রকাশ করি, আকাঙ্ক্ষা ও গূঢ় সংবেদনা জানাই, ফুলশয্যা রচনা করি, অপেক্ষার ভাষা শিক্ষা করি। ফুল আমাদের সংযত হতে শিক্ষা দেয়, আবার বিদ্রোহী হওয়ার প্রেরণা জোগায়। ‘একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটি মনে পড়ে?

কিন্তু ফুল ও প্রকৃতির প্রতি আমাদের বর্তমান আচরণ পশুত্ব থেকে খুব বেশি ওপরে উঠতে পারেনি।

বৃক্ষনিধন, বন ধ্বংস এবং খাদ্যের জন্য পশুজাতির প্রতি ব্যবহারেও মানুষ খুব সভ্য হয়েছে বলে দাবি করতে পারে না। আজকের যুগে মানুষের হিংস্রতা, লোভ ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবল প্রতিযোগিতাই মানুষ মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের দুয়ারে নিয়ে চলেছে। স্টিফেন হকিং এ সতর্কবাণীই প্রকাশ করেছেন। মহাসমুদ্রের অধিপতি সৌন্দর্যসম্রাট তিমিরা সমুদ্রচরে উঠে আত্মহত্যা করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

বনের কুসুম, উদ্ভিদজগৎ, সমুদ্রের মত্স্য, বাতাসে অক্সিজেন ক্রমেই কমে আসছে। অথচ তারার অশ্রুবিন্দু, শিশিরের শব্দ, চাঁদ ও সূর্যের  কিরণের গানে মানুষ জীবনধারণ করে। বাগান ও বনের নম্র ফুলও করে। গাছপালাও তাই। পশু-পাখিও বেঁচে থেকে অমূল্য জীবনের জয়গান গায়। আমাদের খুব কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ও সংবৎসরের কিছু ঝরনা আছে। আছে হাওর, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের প্রমত্ত সৌন্দর্য ও সুবাস। বসন্তের ওই যে গামারি, শিমুল, নাগকেশর, পলাশ ও অশোকের আকুল ঐশ্বর্য। সুন্দরবনের পশু-পাখি, গাছপালা ও নদী-সাগর সঙ্গমের ষড়ৈশ্বর্য এবং বাঘের গর্জন, হরিণের চকিত নয়নের ঈক্ষণ। উড়ন্ত সিন্ধু ইগলের দেখানো শুভ্র বক্ষসম্পদ। উত্তরবঙ্গ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের শীতে আছে দিনমান কুয়াশায় ঠাসা চমকিত মায়াবিভ্রম। বর্ষায় আছে সাজেক পাহাড়ের কুয়াশা। আবার কেউ না কেউ নদী-মেঘলা বাংলাদেশকে সচেতনভাবে খুঁজে বেড়ায় পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা-কর্ণফুলীর উজান-ভাটি সর্বত্র। ব্রহ্মপুত্রের চীন অংশে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প করছে চীন। তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলের সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী।

আবার কেউ না কেউ রাজশাহী ও নবাবগঞ্জের আম্রকাননে ফাল্গুনে-জ্যৈষ্ঠে তার ঐশ্বর্য বা অভিমান খুঁজতে যায়। দুর্লভ চিতাবক, কালো ঝুঁটি বুলবুলি, সমুদ্র-গোলাপ, মধুমঞ্জরি, বিচিত্র বকুল, বিদেশিনী কক্কোলোভা, কুর্চি বা ঝরনাতলার নির্জনতা খুঁজতে খুঁজতে আমার স্বদেশ ভ্রমণের অনুস্মৃতি এই বই।

প্রকৃতির এই মালা রচনা শুরু করেছি ছেলেবেলা থেকে, মনে মনে। কর্ণফুলী, ইছামতী ও সুন্দরী খালবেষ্টিত আমার গ্রাম ইছামতী। আমাদের সুবিশাল ভিটায় পুকুর, ছোট পুকুর, টোয়া, ধানি জমি, সবজিক্ষেত, শতাব্দীর গাছপালা সবই ছিল। এখন কিছুই নেই, কর্ণফুলী ও ইছামতী সব নিয়ে গেছে। বাবার স্বাধীন ডাক্তারি পেশা ও নিজের জমির চাষবাসের বহর আমাকে দিয়েছে প্রকৃতিপাঠ। এ বিষয়ে সর্বশেষ বই এই ‘অভিমানী নদী ও নীলিমা’। এই ভালোবাসা গ্রাম থেকে পাওয়া। কথাপ্রকাশ প্রকাশনা থেকে এই বই এবং ‘শ্রামণ গৌতম’ মুক্তি পেয়েছে। আমি বিশ্বাস করি প্রকৃতি ছাড়া মানুষ দু-দণ্ডও বাঁচতে পারে না; কিন্তু প্রকৃতি খুব ভালো বাঁচতে পারে মানুষ ছাড়া। এই শিক্ষা আমি মান্য করি।


মন্তব্য