kalerkantho


ফুটল মেলার আসল মহিমা

নওশাদ জামিল   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ফুটল মেলার আসল মহিমা

দল বেঁধে মানুষ আসবে, বই কিনবে, বই পড়বে—বইমেলার আসল মহিমা যদি তা হয়, ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার ছিল তেমনই একটি দিন। দিনভর অসংখ্য পাঠক, ক্রেতা, দর্শনার্থীর প্রাণস্পন্দনে মুখর ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বিকেল থেকে ক্রমেই বাড়ছিল বইপ্রেমী মানুষের ভিড়। সন্ধ্যা নাগাদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিল জনজোয়ার। প্রকাশকদের প্রশস্ত হাসি দেখেই বোঝা গেল, বিক্রিবাট্টা মন্দ হয়নি। সব মিলিয়ে বইমেলার প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠল তৃতীয় দিনে এসে।  

গতকাল সকাল ১১টায় মেলার দ্বার খোলার পর থেকে রাত সাড়ে ৮টায় বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ছিল বইপ্রেমীর ভিড়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১ট পর্যন্ত ছিল শিশু প্রহর। এ সময় মেলার দখল নিয়েছিল শিশুরা। অবশ্য ছোটদের সঙ্গে ছিল বড়রাও। সকাল থেকেই অসংখ্য মানুষ ঘুরেছে মেলা আঙিনায়, কিনেছে প্রিয় লেখকের বই।

মা-বাবার হাত ধরে কিংবা কোলে চড়ে সকাল সকালই শিশুরা হাজির হয় মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিশু চত্বরে। সেখান তাদের দিকে বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে উপস্থিত ছিল সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি। তাদের সঙ্গে মজা করে আর তাদের জন্য তৈরি মঞ্চে নানা ধরনের শিক্ষণীয় খেলায় অংশ নিয়ে অন্য রকম এক দিন পার করেছে শিশুরা। সন্তানের বাঁধনহারা খুশিতে আনন্দিত অভিভাবকরাও। পুরান ঢাকার ফারিয়াজ মায়ান হক বলল, ‘অনেক বই কিনে দিয়েছে আব্বু। বইগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ’

শিশু প্রহর শেষে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তখন থেকেই উত্সুক মানুষের ভিড় ছিল মেলাজুড়ে। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের কেউ ব্যস্ত বই কিনতে, কেউ ব্যস্ত দেখতে; কেউ বা শুধুই ঘুরতে এসেছিল। তাদের আনন্দমুখর উপস্থিতিতে মেলার তৃতীয় দিনটি কাটল চমত্কার।

বইমেলায় আসছেন প্রিয় লেখকরাও। গতকাল মেলা প্রাঙ্গণে দেখা মিলল কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, মোস্তফা কামাল প্রমুখ খ্যাতিমান লেখকের। গতকালই মেলায় প্রথম এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। পার্ল পাবলিকেশনসের স্টলে দীর্ঘক্ষণ ভক্ত-অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দেন তিনি। বইমেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ছুটির দিন স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। বিপুল মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বইয়ের প্রতি, বইমেলার প্রতি আমাদের আকর্ষণ সত্যিই প্রশংসনীয়। ’

আজ শনিবার এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার দ্বিতীয় শিশু প্রহর। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় শিশু প্রহর অনুষ্ঠিত হবে।

সাহিত্য সম্মেলনের শেষ দিন আজ : অমর একুশে গ্রন্থমেলার পাশাপাশি বাংলা একাডেমিতে চলছে চার দিনের আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। আজ শনিবার এ সম্মেলনের সমাপনী দিন। গতকাল শুক্রবার সম্মেলনের তৃতীয় দিনে ছিল পাঁচটি ভিন্ন অধিবেশন।

গতকাল সকালে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘বাংলা কবিতা’ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্যামলকান্তি দাশ এবং অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেন কবি অসীম সাহা, ইকবাল হাসান, তুষার দাশ, ফরিদ কবির। এই অধিবেশন সভাপতিত্ব করেন কবি আসাদ চৌধুরী। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে ‘বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্য’ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক শান্তনু কায়সার ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাবন্ধিক সুমিতা চক্রবর্তী। আলোচনায় অংশ নেন পশ্চিমবঙ্গের গবেষক সুনন্দা সিকদার, কথাসাহিত্যিক পূরবী বসু, প্রাবন্ধিক মোরশেদ শফিউল হাসান, অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান, অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল, পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র গবেষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, চীনের অনুবাদক ইয়াং উই মিং সর্না, পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ইমানুল হক। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার। একই স্থানে ‘মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য’ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেন প্রাবন্ধিক মফিদুল হক, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, পশ্চিমবঙ্গের গবেষক জিয়াদ আলী, ড. আমিনুর রহমান সুলতান। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন। বিকেলে শহীদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে ‘সাহিত্য ও ফোকলোরের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া’ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফিরোজ মাহমুদ ও শাহিদা খাতুন। আলোচনায় অংশ নেন শফিকুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ, সাইমন জাকারিয়া ও সাকার মুস্তাফা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সন্ধ্যায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অন্য ভাষার কবির স্বরচিত কবিতা এবং ছড়া পাঠ। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সুকুমার বড়ুয়া।

নতুন বই : একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় নতুন ১৩০টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৩, উপন্যাস ২৮, প্রবন্ধ ৩, কবিতা ৪১, গবেষণা ৪, ছড়া ৭, শিশুসাহিত্য ৪, জীবনী ৪, মুক্তিযুদ্ধ ৭, নাটক ১, বিজ্ঞান ২, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ৩, রম্য/ধাঁধা ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ১ এবং অন্যান্য বিষয়র ওপর বই এসেছে ১০টি। এ ছাড়া গতকাল মেলায় ১৪টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। নতুন আসা গুরুত্বপূর্ণ চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি  তুলে ধরা হলো।

কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ শাখায় : সদ্যপ্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের শেষ কবিতার বই ‘কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ শাখায়’। জীবনের শেষবেলায় লেখা তাঁর এ বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরি পাবলিকেশনস। মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে তিনি যখন লড়াই করছিলেন, তখন হাসপাতালের শয্যায় লেখেন বেশ কিছু কবিতা। গোধূলিসন্ধ্যায় পৌঁছে কবি জীবন ও পৃথিবীকে দেখেছেন অন্যতর অনুভব দিয়ে। তাঁর সেই অনুভবরাশি পাঠকের হৃদয়ে ধরা দেবে আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়ে। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৫০ টাকা।  

লালন সাঁই : মরমি ও দ্রোহী : বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক আবুল আহসান চৌধুরীর গবেষণাগ্রন্থ ‘লালন সাঁই : মরমি ও দ্রোহী’। লালন সাঁই শুধু মরমি কবি ছিলেন না, ছিলেন একজন দ্রোহীও। জমিদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ ছাড়া সমাজের নানা সংস্কারের বিরুদ্ধে, নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কাজ করে গেছেন লালন। আবুল আহসান চৌধুরী ভিন্ন আলেখ্যে তুলে ধরেছেন সেই পূর্বাপর ঘটনাবলি। বইটি প্রকাশ করেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী রফিকুন নবী। দাম ৫৫০ টাকা।

নিঃসঙ্গতার মতো একা : কবি ও কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজের কবিতার বই। আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গচেতনা, তার সঙ্গে যাপিতজীবনের নানা টানাপড়েনকে কবি তুলে ধরেছেন তাঁর কাব্যপ্রতিমায়। কল্পনা, প্রতীক, দৃশ্যকল্পের নবব্যঞ্জনায় মাহবুব আজীজ পাঠকদের নিয়ে যাবেন এমন এক জাদুবাস্তবতার জগতে, সেখানে ফুটে ওঠে জীবনের গূঢ়তর তাত্পর্য। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৫০ টাকা।

রেস্তোরাঁ রহস্য : মোস্তফা মামুনের কিশোর উপন্যাস। লেখকের তনু কাকা সিরিজ বেশ জনপ্রিয়। তাঁর একটি প্রিয় চরিত্রও এটি। তনু কাকা সিরিজের নতুন বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশনস। রহস্য, ভৌতিক, থ্রিলার ও রোমাঞ্চপ্রিয় কিশোর পাঠকদের আনন্দের খোরাক হতে পারে। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ২০০ টাকা।

এ ছাড়া পাঞ্জেরি পাবলিকেশনস এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো’, অন্যপ্রকাশ এনেছে মোহিত কামালের ‘বিষাদ নদী’, শিশুরাজ্য প্রকাশনা এনেছে আহসান হাবীবের ‘কমিকস ভয়ঙ্কর পোকা’, আফসার ব্রাদার্স এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘তারুণ্যের এপিঠ ওপিঠ’, অন্যপ্রকাশ এনেছে মোস্তফা কামালের রোমান্টিক উপন্যাস ‘রূপবতী’, অনন্যা প্রকাশ এনেছে মহাদেব সাহার ‘মাটির সম্ভার’ ইত্যাদি।


মন্তব্য