kalerkantho


সিরিয়া ও ইরাকে ৫০ বাংলাদেশি আইএসে!

এস এম আজাদ   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সিরিয়া ও ইরাকে ৫০ বাংলাদেশি আইএসে!

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে বাংলাদেশের অন্তত অর্ধশত নারী-পুরুষ সিরিয়া ও ইরাকে গেছে। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন বিদেশিও ওই দুটি দেশে গেছে আইএসে যোগ দিতে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে ধারাবাহিকভাবে এমন তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এই তথ্যের ভিত্তিতে দেশত্যাগী জঙ্গিদের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আত্মগোপনে থাকা বেশ কয়েক ব্যক্তি ও পরিবার গত দুই বছরে আইএসের ডেরায় গেছে। এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর দেশে তাদের যোগাযোগসহ সব ধরনের সূত্র খতিয়ে দেখেছে পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এরই মধ্যে দেশছাড়া জঙ্গিদের নব্য জেএমবিকে সহায়তা দেওয়ার তথ্য মিলেছে। অনেকে নব্য জেএমবির জন্য অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সিরিয়া বা ইরাকে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক তৈরি হতে দেননি তাঁরা। অর্থ সরবরাহকারী চক্রকে শনাক্ত করা হয়েছে।

নজরদারিতে রাখা হয়েছে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও পরিবারকে। ইমিগ্রেশনে দেশত্যাগী জঙ্গি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা দেশে ঢুকতে এলেই গ্রেপ্তার করা হবে। তাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠ জনদের চলাচলেও রয়েছে কড়াকড়ি।

পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সূত্র মতে, আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে ৫০ জন বাংলাদেশ ছেড়ে সিরিয়া ও ইরাকে গেছে তাদের মধ্যে আছে সাবেক এক সচিবের ছেলে, চিকিৎসক, কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। এ ছাড়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একই পরিবারের ১২ সদস্য, একাধিক তরুণ-তরুণী গেছে যুক্তরাজ্য থেকে। জাপান থেকে গেছে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক দম্পতিসহ আরো কয়েকজন। তারা বাংলাদেশে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করছেন র‌্যাব-পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেছেন, ‘যারা গোপনে দেশত্যাগ করে আইএসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের ব্যাপারে আমাদের কঠোর নজরদারি আছে। এর মধ্যে কেউ বাংলাদেশে আসতে চেষ্টা করলে তা যেন সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের জানানো হয় তেমন সিদ্ধান্ত আছে। তাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ’ 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা দেশ ছেড়ে গেছে তাদের ব্যাপারে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের দেশে প্রবেশ, সহযোগী বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ—সবাই আমাদের নজরদারিতে আছে। ’

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বারিধারার বাসিন্দা তাহমিদ সাফি ও তাঁর স্ত্রী সায়মা খান মধুচন্দ্রিমায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা বলে ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল বাসা ছাড়েন। তিন মাস মালয়েশিয়ায় থাকার পর তাঁরা চলে যান আইএস অধ্যুষিত এলাকায়। তাহমিদ তাঁর মায়ের সঙ্গে আগে যোগাযোগ রাখলেও এখন আর নেই। স্বজনরা খিলক্ষেত থানায় একটি জিডি করেছেন। একইভাবে নিরুদ্দেশ হয়েছেন বারিধারা ডিওএইচএসের বাসিন্দা চিকিৎসক আরাফাত রহমান তুষার। শুরুর দিকে তুষার দেশে যোগাযোগ রাখলেও বর্তমানে কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁর অবস্থান সিরিয়ায় বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

র‌্যাব ও পুলিশের নিখোঁজ তালিকায় থাকা বারিধারার দুই ভাই ইব্রাহীম হাসান খান ও জুনায়েদ হাসান খান সৌদি আরবে ছিলেন। গুলশানে জঙ্গি হামলার পর পুলিশের তদন্তে ইব্রাহীমের সিরিয়া যাওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। গুলশানে হামলার আগে-পরে জুনায়েদ বাংলাদেশে ছিলেন বলে তথ্য মিলেছে। পরে তিনি ভারতেও যান। এরপর সিরিয়া বা ইরাকে আইএসের আস্তানায় গেছেন বলে ধারণা গোয়েন্দাদের। গত বছরের অক্টোবরে জুনায়েদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হঠাৎ চালু হয়। সেখানে আইএসের পতাকাতলে দুই ভাইয়ের ছবিও আপলোড করা হয় তখন।

পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক সূত্রে জানা যায়, আইএস আস্তানায় যেতে ব্যর্থ হয়ে কয়েকজনের দেশে ফেরার তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে আছেন ডেসকোর সাবেক প্রকৌশলী গাজী কামরুস সালাম সোহান। ২০১৫ সালের মে মাসে তিনি তুরস্ক সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তুর্কি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে পাঠায়। প্রায় দেড় বছর পর ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁর ঠাঁই হয় জেলহাজতে।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ১৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিল নব্য জেএমবির পলাতক জঙ্গি বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেট। এই টাকা আসে আইএস মতাদর্শীদের কাছ থেকে। এমন তথ্য পেয়ে টাকার উৎস এবং বিদেশে থাকা আইএস মতাদর্শীদের যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিছুটা যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হলেও বাংলাদেশে নব্য জেএমবির সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত হতে পারেনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে সিরিয়া ও ইরাকে যাওয়া জঙ্গিদের স্বজন, সহযোগী ও ঘনিষ্ঠজনদের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। বাইরে থেকে কেউ বাংলাদেশে এসে আবার সিরিয়া বা ইরাকে যেতে পারে—এমন সতর্কবার্তা আগেই পাওয়া গেছে। ফলে ইমিগ্রেশনকেও অ্যালার্ট করা হয়েছে।

সিটিটিসি ইউনিট সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় ঈদ করার কথা বলে গত বছরের ১০ জুলাই পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগের স্লিপিং ডিসঅর্ডারের চিকিৎসক ডা. রোকনুদ্দীন খন্দকার। যাওয়ার আগে তিনি শিশু হাসপাতালের চাকরিতে ইস্তফা দেন। তাঁর স্ত্রী যশোর সরকারি এমএম কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাইমা আক্তার দেশ ছাড়ার আগে বিদেশে ভ্রমণ করার কথা বলে ছুটি নিয়েছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকায় কবি নজরুল সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন। তাঁদের সঙ্গে দেশ ছাড়েন দুই মেয়ে রেজোয়ানা রোকন ও রামিতা রোকন এবং রেজোয়ানার স্বামী সাদ কায়েস ওরফে শিশির। রোকন রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায় নিজের পাঁচতলা ভবন, চেম্বারসহ বেশ কিছু সম্পত্তি স্বজনদের দান করে যান। তাঁর বড় মেয়ে রেজোয়ানা রোকন ও তাঁর স্বামী শিশির নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে পড়তেন। ২০১৪ সালের মার্চে তাঁরা নিজেরাই বিয়ে করেন। শিশিরের বাড়ি শনির আখড়া এলাকায়। ডা. রোকনের ছোট মেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী রামিতা রোকন পরীক্ষার আগেই পরিবারের সঙ্গে দেশ ছাড়ে। জানা যায়, পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমান ডা. রোকন। এর আগে পরিবার ও সহযোগীদের কাছে নব্য জেএমবির জন্য ৮০ লাখ টাকা রেখে যান তিনি। সর্বশেষ তথ্য মতে, রাকা শহরের আইএস ঘাঁটিতে অবস্থান করছে রোকনের পরিবার। সেখানে আইএস জঙ্গিদের শিশুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন রোকন। তাঁর স্ত্রী আইএস মতাদর্শীদের শিক্ষাবিষয়ক কাজে সহায়তা করছেন।

নাঈমা আক্তারের বড় বোন হালিমা আক্তার জানান, চৌধুরীপাড়ার বাসায় তাঁরা ভাই-বোন মিলে একসঙ্গে থাকতেন। বিদেশে যাওয়ার পর গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাঈমা বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ওই সময় দেশের নাম না বলে ‘নাঈমা ইসলামিক স্টেটে’ আছেন বলে জানান।  

পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, যুক্তরাজ্যের নাগরিক ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মান্নানের পরিবারের ১২ সদস্য এখন সিরিয়ায়। সেখানে এক থেকে ১১ বছর বয়সী তিনটি শিশু রয়েছে। তারা আইএস নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আছে বলে ধারণা করছে ব্রিটেনের বেডফোর্ডশায়ার। ২০১৫ সালের ১০ এপ্রিল যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে এসে ১১ মে তুরস্কের ইস্তাম্বুল হয়ে পরিবারটি সিরিয়ায় চলে যায়।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক জাপানি শিক্ষকের ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তার মতে, জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল্লাহ ওজাকি বাংলাদেশে জঙ্গি তত্পরতা সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ওই ব্যক্তি জাপানে বিয়ে করে নাগরিকত্ব পান। তিনি সেখান থেকে বুলগেরিয়ায় যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ হন। এর মধ্যে তিনি বাংলাদেশ থেকে দুই তরুণকে সিরিয়ায় পাঠান।


মন্তব্য