kalerkantho


হত্যা-নির্যাতনের বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় আপস

রেজাউল করিম   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হত্যা-নির্যাতনের বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় আপস

রাজধানীসহ সারা দেশে গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে অহরহ। খুব অল্প ঘটনাই বাইরে থেকে কেউ জানতে পারছে। চরম আকার ধারণ করলেই কেবল জানাজানি হচ্ছে বা গণমাধ্যমে আসছে অথবা মামলা হচ্ছে। আবার হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনায় হওয়া মামলাগুলো বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকায় একপর্যায়ে ধৈর্যহারা হয়ে যায় ভুক্তভোগীর পরিবার। তখন গৃহকর্তা-কর্ত্রীদের প্রস্তাবে আপস করতে বাধ্য হয়।

বিচার না হওয়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকে রাজধানীর কাফরুলে গৃহকর্মী জনিয়াকে (১৫) ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ অন্যতম। এ ঘটনায় কাফরুল থানায় প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হয়, পরে আদালতের নির্দেশে সেটি হত্যা মামলা হয়। ওই ঘটনায় এলাকাবাসী আন্দোলনও করেছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জনিয়ার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করা হয়। অথচ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্তে এ ঘটনাটি ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মেলেনি। তাই তদন্ত প্রতিবেদনে জনিয়ার মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলেই তুলে ধরা হবে।

আরেকটি ঘটনার কথা তুলে ধরা যাক। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বাসায় নির্যাতনের শিকার হয় গৃহকর্মী জেসমিন আক্তার (১৮)। কাচের গ্লাস ভাঙার অভিযোগে তাকে অমানবিক নির্যাতন চালায় গৃহকর্ত্রী। এরপর বরিশালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ওই ঘটনায় তাঁর বাবা বাদী হয়ে বরিশালে হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামি ইসরাত জাহান নাসরিন ও নাজমা আক্তার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেত্রী বলে জানা যায়। দুজনকে অভিযুক্ত করে ২০১৪ সালের শেষ দিকে আদালতে অভিযোগপত্রও দেয় পুলিশ। কিন্তু এই মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের জন্য গত বছরের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।

এ ছাড়া গত বছরের মে মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নির্মম নির্যাতনে মারা যায় গৃহকর্মী হাসিনা। কাজে যোগ দেওয়ার চার মাসের মাথায় তার মৃত্যু হয়। ১১ বছর বয়সী হাসিনার সারা শরীরে ছিল নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হাসিনা মারা যাওয়ার পর তার রিকশাচালক বাবা আবদুস সোবাহান ক্ষোভে-দুঃখে ঢাকা ছেড়ে সপরিবারে গ্রামে চলে যান।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্যানুযায়ী গত ১০ বছরে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ১০০ গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা জানা গেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৫৭০টি মামলা হয়েছে।

আসকের হিসাব অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে দেশে বছরে গড়ে ৫০ জনের বেশি গৃহকর্মী মারা যাচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক এবং গৃহকর্মী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না বলেই এ ঘটনা কমছে না।

আসকের উপপরিচালক নীনা গোস্বামী কালের কণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মী নির্যাতনের একটি মামলায়ও ভালো (ভুক্তভোগীর পক্ষে) রায় পাওয়া যায় না। দেখা যায়, কোনো গৃহকর্মী হত্যা হলে, সেটি প্রথমেই আত্মহত্যার কথা বলে প্রচারণা চালানো হয়। প্রভাবিত করে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও আত্মহত্যার কথা বলানো হচ্ছে। আবার আদালতে আসামিরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে তাদের পক্ষে রায় নিচ্ছে।

নীনা গোস্বামী বলেন, কোনো ঘটনায় মামলা করার পর নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী আদালতে গৃহকর্তা বা কর্ত্রীর বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেয়। অথচ মামলার অভিযোগ গঠনের সময় আসামি অভিযুক্ত হচ্ছে না। দেখা যায়, নির্যাতিত গৃহকর্মীর পরিবারকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলায় পার পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। ক্রিকেটার শাহাদতের গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বেশির ভাগ মামলার ক্ষেত্রেই এ রকম হচ্ছে। টাকার কাছে সব কিছু হেরে যাচ্ছে। নীনা গোস্বামী বলেন, এর প্রভাব সমাজে পড়ছে ব্যাপক হারে। ফলে গৃহকর্মী নির্যাতন কমছে না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যন অনুযায়ী ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬—এই চার বছরে সারা দেশে ৩০৮ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১২২ গৃহকর্মী হত্যার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গত বছর ২৫ জন, ২০১৫ সালে ৩০ জন, ২০১৪ সালে ৩৯ জন ও ২০১৩ সালে ২৮ গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, হত্যা করা গৃহকর্মীদের বেশির ভাগই শিশু। বেশির ভাগ ঘটনায়ই মামলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় রায় আসেনি। ফলে এখনো সমাজের পুঁজিপতিদের পরিবারের গৃহকর্মীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, গৃহকর্মী হত্যাকাণ্ডের অল্প কিছু মামলায়ও যদি রায় হতো, তাহলে গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা সাবধান হতেন।

গৃহকর্মী জেসমিন হত্যার ঘটনার ব্যাপারে আয়শা খানমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এ রকম নানাভাবে প্রভাবিত করেই বেশির ভাগ মামলায় অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গৃহকর্মী হত্যার একটা ঘটনায়ও এখন পর্যন্ত সেরকম রায় পাইনি। গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রতিটি মামলা যে সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা কথা তার চেয়ে কয়েক গুণ সময়ক্ষেপণ করছে পুলিশ। আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে অনেক দেরিতে। এমন সময় মামলার বিচারকাজ শুরু হয়, যখন ভুক্তভোগীর পরিবার আদালতে ঘুরতে ঘুরতে ধৈর্যহারা হয়ে যায়।

সালমা আলী বলেন, গৃহকর্মীদের পরিবার গরিব। তারা আদালতে ঘুরবে নাকি পেট বাঁচানোর জন্য কাজ করবে? তিনি বলেন, কিন্তু অভিযুক্তরা সবাই প্রভাবশালী। দীর্ঘ সময় মামলা চলতে থাকায় একটা পর্যায়ে মা-বাবা টাকার বিনিময়ে আপস করে ফেলেন।


মন্তব্য