kalerkantho


শিশুদের অবাধ ব্যবহার, বাড়ছে হত্যা ধর্ষণ নির্যাতন

রেজাউল করিম   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিশুদের অবাধ ব্যবহার, বাড়ছে হত্যা ধর্ষণ নির্যাতন

গৃহকর্মী হিসেবে অবাধে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। এদের মধ্যে বহু গৃহকর্মীর বয়স ১২ বছরের কম। অথচ ১২ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ দেওয়া যাবে না বলে হাইকোর্টের নির্দেশ এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, গৃহকর্মীদের একটি বড় অংশই শিশু। এর ওপর আবার এসব শিশুকে দিয়ে সামর্থ্যের চেয়ে ভারী কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বেশির ভাগ শিশু গৃহকর্মী।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফের এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী রয়েছে। এর ৮০ শতাংশই মেয়ে শিশু বা নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৪ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত এক লাখ ২৫ হাজার শিশুকর্মীর বয়স পাঁচ থেকে সতের বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ মেয়ে শিশু। আর ২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৫ বছর বয়সের ওপরের প্রায় ৯ লাখ শিশু গৃহকর্মী রয়েছে। এদের আবার ৮৩ শতাংশ মেয়ে শিশু বা নারী। আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচজন শিশু গৃহকর্মী হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং ধর্ষণের শিকার হয় পাঁচজন। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ১১ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে ৯ শিশু গৃহকর্মীকে। এর আগে ২০১৫ সালে ৯ শিশু গৃহকর্মী হত্যার ঘটনা ঘটে, ধর্ষণের শিকার হয় ১১ জন। আত্মহত্যা করে ১৩ জন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে হয় ২২ শিশু গৃহকর্মীকে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুস শহীদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, দরিদ্র পরিবারগুলোয় শিশুসন্তানের জীবনভার বহন করতে না পেরে গৃহকর্মী হিসেবে অন্যের বাড়িতে দিচ্ছেন মা-বাবা। আবার নিজের মতো করে ব্যবহার করা যাবে—এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সচ্ছল পরিবারগুলো শিশুদেরই গৃহকর্মী হিসেবে নিচ্ছে। এসব শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়ার পর তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়। তাদের বেতন দেওয়া হয় নামমাত্র, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেতনও দেওয়া হয় না। কিন্তু কাজ করানো হয় দিনের অধিকাংশ সময়।

আব্দুস শহীদ নাসিম আরো বলেন, এসব গৃহকর্মীর যে মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার বলে কোনো কিছু আছে, তা গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা স্বীকারই করেন না। তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার এসব শিশুর বেশির ভাগেরই বয়স আট থেকে বারো বছরের মধ্যে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, বয়স ১২ বছরের কম এমন শিশুদের গৃহকর্মে নিয়োগ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের ওপর সব ধরনের নির্যাতনও বন্ধ করতে বলেছেন আদালত।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির করা এক রিট আবেদনে ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ওই আদেশ দেন।

সালমা আলী বলেন, উচ্চশিক্ষিত, অশিক্ষিত সব ধরনের পরিবারেই শিশু গৃহকর্মী রয়েছে। এটি ঠেকানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, একটি দরিদ্র পরিবারের শিশুর যদি পড়ালেখাসহ জীবনযাপনের ন্যূনতম পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কোনো শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে দেখতে হবে না।

শিশুবিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদ ফেরদৌসী কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৫ সালে সরকার গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা প্রণয়ন করে। এতে বলা হয়েছে, ‘হালকা কাজের ক্ষেত্রে ১২ বছর বয়ঃপ্রাপ্ত শিশু নিয়োগ করতে হলে আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিয়োগ লাভে ইচ্ছুক ব্যক্তির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে নিয়োগ প্রদান যুক্তিযুক্ত। তবে মৌখিক চুক্তি বা সমঝোতা বা ঐকমত্য সম্পন্ন হলে গৃহকর্মী ও নিয়োগকারীর কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। ১২ বছর বয়ঃপ্রাপ্ত কোনো শিশুকে হালকা কাজে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার স্বাস্থ্য ও উন্নতির জন্য বিপজ্জনক নয় অথবা শিক্ষাগ্রহণকে বিঘ্নিত করবে না তা বিবেচনায় নিতে হবে। ’

ড. নাহিদ ফেরদৌসী বলেন, ‘নীতিমালাটি ভালো। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো বাস্তবায়ন নেই। ১২ বছরের কোনো শিশুকে গৃহকর্মে নিয়োগ দিলে তার একাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে নিয়োগকর্তাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এসবের কোনো বাস্তবায়ন নেই। ’

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শিশু গৃহকর্মী নিরসনের কাজও চলছে। তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর বিনা মূল্যে পড়ালেখা এবং তাদের জীবন যাতে স্বনির্ভর হয়, এ জন্য কাজ করছে সরকার। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, শিশু গৃহকর্মী থাকবে না। এ ছাড়া সমাজ ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে শিশুদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ না দিতে।


মন্তব্য