kalerkantho


‘ইউনিকোডের ইলশে গুঁড়ি’

মোহীত উল আলম   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘ইউনিকোডের ইলশে গুঁড়ি’

আশা ছিল পাঁচটি বই বের করব। সে মতো পাণ্ডুলিপি তৈরির মানসিক প্রস্তুতিও ছিল।

কিন্তু ব্যস্ততার কারণে শুধু একটি বই-ই বের করতে পারলাম। কবিতার বই, শিরোনাম দিলাম— ‘ইউনিকোডের ইলশে গুঁড়ি’। বের করল ‘চৈতন্য’, যার স্বত্বাধিকারী সিলেট নিবাসী মো. জাহিদুল হক চৌধুরী রাজীব। চমত্কার একটি প্রচ্ছদ করলেন তৌহিন হাসান। দাম রাখা হলো ১৬০ টাকা।

সমধারা নামক একটি সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের যেকোনো অনুষ্ঠানে প্রচুর দর্শকের মধ্যে ব্যাপক নারী কবি-লেখকের সমাগম হয়। তাদের একটা সভায় জোর গলায় বললাম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কবিতা প্রকাশ করা আমি কোনো অবমাননাকর বিষয় মনে করি না। কথাটি বলাতে নারীকুলের প্রচুর করতালি পেলাম। কারণ সম্ভবত সাহিত্য পাতায় তাদের কবিতার সংখ্যা কম থাকে।

বললাম, পত্রিকার সাহিত্য পাতায় প্রকাশের জন্য কবিতা পাঠিয়ে যে অপেক্ষাটা করতে হয় সেটি আমার বার্ধক্যে উপনীত বয়সের ধৈর্যে কুলায় না। ফেসবুকে দিলাম, ব্যস, কাজ শেষ। লাইক পড়ল, মন্তব্য পড়ল, বেশ খুশি আমি।

কিন্তু ফেসবুকে তো আর বিজয় ফন্টের বাংলা ঢোকানো যায় না। অভ্র ফন্টের আশ্রয় নিলাম, যেটা দিয়ে অনলাইনে টাইপ করা যায়। কিন্তু রেফ লেখার সময় একটা ‘জাঁক’ থেকেই যাচ্ছিল। তখন বিজয় ফন্ট ইউনিকোডের সৃষ্টি করল অনলাইনে বাংলা লিখিয়েদের জন্য, যেটা আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা লেখার ব্যাপারে নতুন দুয়ার খুলে দিল। অভ্র ফন্টের জাঁক থেকে বের হয়ে ইউনিকোডের মুক্ত ফন্টে লেখার বিষয়কে অবলম্বন করে একদিন একটা কবিতা বেরিয়ে এলো, যার শিরোনাম দিলাম, ‘ইউনিকোডের ইলশে গুঁড়ি’ আর বই বের করার সময় যখন একটা পছন্দসই নাম খুঁজছিলাম, তখন কবি এহসান হাবীব বললেন, ‘ইউনিকোডের ইলশে গুঁড়ি’টাই নাম হোক, আর সে প্রস্তাবে আমার আরেক তরুণ সহকর্মী, গল্পকার মেহেদী উল্লাহ হাততালি দিয়ে বিপুল সমর্থন জানালেন।

এটি আমার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ এবং কবিতা মোট ঢুকল ৭১টি। এগুলো আগেই ইলশে গুঁড়ির মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেসবুকে আমার টাইমলাইনে ছিল। তারিখ সহকারে। যদিও প্রকাশের সময় কালানুক্রম ঠিক রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি।

আমি যে কবিতা লিখি বা লিখতে পারি বা আমার কবিতাগুলো কবিতা হয় কি না—এ নিয়ে একটা বিরাট সংশয় মেশানো গোপন মনোভাব আমার সারা জীবনের। তাই ‘টইটম্বুর’ শিশুপত্রিকার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কবি ও ছড়াকার আলম তালুকদার যখন বললেন, আপনি আবার কবিতাও লেখেন নাকি! অনুযোগটা হজম করলাম। সঙ্গে ছিলেন ছড়াকার রহীম শাহ। বললেন, কী বলেন, মোহীত ভাই সত্তর দশক থেকে কবিতা লিখছেন। আলম তালুকদার রসিক মানুষ। কথা ঘুরিয়ে বললেন, না, উনার কবি হিসেবে নাম ফাটে নাই। সে বহু বহু বছর আগে আমার আবাল্য বন্ধু আবু করিম একদিন একসঙ্গে রাতের খাওয়াদাওয়া সম্পন্ন করার পর আমাকে বন্ধু হিসেবে হিতোপদেশ দিয়েছিল যে, আমি যেন কবিতা না লিখে গল্পে মনোনিবেশ করি। কথাটা সত্যি—কবিতা লেখার চেয়ে আমি গল্প ও উপন্যাস লেখায় স্ব্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু কবিতার ব্যাপারটা হলো, ওটি আসবেই—হুড়মুড় করে আসবে, আসবে মাঝ রাতে, ঝড়ের রাতে, যখন একা একা প্রহর গুনি তখন, যখন দাপ্তরিক কাজে ক্লান্ত আর ত্যক্ত-বিরক্ত, তখন ইলশে গুঁড়ির মতো ওটা আসবেই। আমি তখন অসহায়। এনড্রয়েড সেটের ওপরই লিখে ফেলি ঝট ঝট—হই না কেন আমি যতই অনুল্লেখ্য একজন কবি।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার খুব প্রিয় কবি। কবিতা লেখা আবেগের ব্যাপার হলেও তারও একটা শৃঙ্খলা আমি মেনে নিলাম। শক্তির অনুকরণে প্রচুর সনেট লিখলাম, যদিও সনেট লেখার মৌলিক নিয়ম মানলাম না—শুধু শেকসপিয়ারের ধরনে চার চার চার আর দুই লাইন ঠিক রাখলাম। কিছুই হয়নি, কিন্তু কিছু একটা তো হলো।

আমি জীবনভর একজন বিরহক্রান্ত লোক। আমার কবিতায় এ বিষয়টিই ঝাঁজালোভাবে আসে। গাছের মগডালে একটি একলা পাতা বাতাসে এদিক-ওদিক ঠোক্কর খাচ্ছে, আর আমি বুঝতে পারছি আমার ভালোবাসাহীন হৃদয়টা ঠোক্কর খাচ্ছে। একদিন ভর দুপুরে ত্রিশাল থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। দিগন্তব্যাপী আমন ধানের সবুজ গালিচায় বর্ষাক্রান্ত মেঘের ফাঁকে ফাঁকে রোদের বিচ্ছুরণ। আমি কী দেখলাম জানি না, কী অনুভূতি হলো জানি না, কিন্তু আমি হু হু করে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলাম।


মন্তব্য