kalerkantho


প্রথম দিনেই প্রাণের কল্লোল

নওশাদ জামিল   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রথম দিনেই প্রাণের কল্লোল

বাঙালির অহংকার অমর একুশে গ্রন্থমেলার দ্বার খুলেছে। গতকাল বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করার পর নিরাপত্তাবেষ্টনী তুলে নেওয়ার পরই মেলাজুড়ে শুরু হয় ক্রেতা-দর্শনার্থীর প্রাণের কল্লোল।

১১ মাসের অপেক্ষা শেষে শুরু হওয়া মেলার প্রথম মুহূর্তেই নামে জনস্রোত। শুরুর দিনেই এমন জনস্রোত দেখে দারুণ খুশি প্রকাশকরা।

তবে স্টল মালিকদের প্রস্তুতির অভাব, উদাসীনতা এবং মেলা কর্তৃপক্ষ বাংলা একাডেমির অব্যবস্থাপনার কারণে অগোছালোভাবেই পর্দা উঠেছে এবারের একুশে গ্রন্থমেলার। নান্দনিক মেলার অনান্দনিক অবয়ব দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। ক্ষুব্ধ অনেক প্রকাশকও। বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

মেলা উদ্বোধনের পর দেখা গেল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশে ছোট-বড় নানা স্টল, প্যাভিলিয়ন; অন্য পাশে মেলায় ঢোকার প্রধান গেট। ঢোকার পথে কৃত্রিম ঝরনা। তাতে এক ফোঁটাও পানি নেই।

মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে স্টল মেরামতের সরঞ্জাম। এখানে-ওখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে কেউ নেই। কিছু স্টল বন্ধ, কিছু স্টলে বইও ওঠেনি।

মেলার প্রথম দিন বলে প্রায় সবাই বই কেনার চেয়ে দেখতেই আগ্রহী ছিল। বিক্রেতাদেরও বই দেখানোর ব্যাপারে আগ্রহ ছিল কম। অনেকেই আবার জোগাড় করে নিয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনীর নতুন বইয়ের ক্যাটালগ। এর মধ্যেও প্রস্তুতিতে এগিয়ে ছিল যেসব স্টল সেগুলোতে বই বিক্রি হতে দেখা গেছে। অনেকের হাতে দেখা গেছে নতুন বইয়ের ব্যাগ।

মেলার প্রথম দিন বলেই হয়তো, এখনো চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্রস্তুতির চিহ্ন। কাঠ, বাঁশ প্রভৃতি। ছিল ধুলার রাজত্ব। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে পাঠকের বইয়ের প্রতি আগ্রহই বেশি দেখা গেল। স্টলে স্টলে গিয়ে পাঠকরা নেড়েচেড়ে দেখছে বই। অনেকে খোঁজ করছে তার প্রিয় লেখকটির বই এসেছে কি না। প্রথম দিনেই প্রিয় লেখকের বইটি হাতে পাওয়ার আগ্রহ। হোক অল্প; কিন্তু বই বিক্রি শুরু হয়ে গেছে বেশির ভাগ স্টলে। প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের মনমাতানো ঘ্রাণ বুকে নিয়ে ফিরতে দেখা গেল অনেক ক্রেতাকে।

সিসিমপুরের স্টলের সামনে ছোটরা ছিল; বড়দেরও ভিড় জমে গিয়েছিল। তা ছাড়া অন্যপ্রকাশ, অনন্যা, তাম্রলিপি, ঐতিহ্য, মাওলা ব্রাদার্সে প্রথম দিনেই চিরচেনা পাঠকের ভিড়। প্রথম দিনেই মেলায় এসেছে স্বনামধন্য লেখকদের বেশ কিছু বই। প্রধানমন্ত্রীর বই এসেছে আগামী প্রকাশনীতে। সেই বইকে ঘিরে পাঠকের ভিড় দেখা গেল। সদ্য প্রয়াত সব্যসাচী লেখকের অনুবাদগ্রন্থ ‘হ্যামলেট’ এসেছে অন্যপ্রকাশের স্টলে। পাঠকের আগ্রহ দেখা গেল বইটিকে ঘিরে।

মেলা ঘুরে দেখা যায়, চারপাশে নতুন বইয়ের ঘ্রাণের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করেছে নানা অসংগতি। মেলা শুরুর আগেই স্টল তৈরির বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও প্রথম দিনে নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেনি অর্ধশত স্টল। সেই সঙ্গে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় থেকে গেছে আবর্জনা। আজকের মধ্যে এসব অসংগতি দূর হবে বলে জানিয়েছে মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রথম দিনের মেলা শেষে প্রকাশকরা বলছেন, অন্য যেকোনোবারের চেয়ে এবার মেলার স্টলবিন্যাস সুন্দর হয়েছে। তবে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে হতাশা ব্যক্ত করেছেন তাঁরা।

গতকাল মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৩০টি স্টল এখনো পরিপূর্ণভাবে চালু করতে পারেননি স্টল মালিকরা। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমির শিশু-কিশোর প্রকাশনা, প্রজ্বলন প্রকাশ, মেধা পাবলিকেশন্স, লাবনী, বর্ষাদুপুর, বনলতা প্রকাশনী, বাঙালায়ন, পিয়াল, অন্যরকম প্রকাশনী, গণপ্রকাশনী, মানুষজন, অভ্রপ্রকাশ, নভেল পাবলিশিং হাউস ও পুঁথিনিলয়। বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকতে দেখা যায় স্টলের নির্মাণসামগ্রীর অবশিষ্ট অংশ। সেই সঙ্গে মেলার উদ্যান অংশের ৭ নম্বর চত্বরে ছিল না বিদ্যুৎ সংযোগ। মেলার নীতিমালা ভেঙে ‘কুঁড়েঘর’ নামে একটি প্রকাশন সংস্থা ছন দিয়ে স্টল নির্মাণ করেছে। এরই মধ্যে স্টলটিকে পুনরায় সজ্জার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে।

এ নিয়ে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের মতো এত অপরিচ্ছন্নভাবে মেলা কখনো শুরু হতে দেখিনি। চরম অব্যবস্থপনার মধ্য দিয়ে মেলা শুরু হয়েছে। ’ একই কথা বললেন অনুপম প্রকাশনীর মিলনকান্তি নাথ। তিনি বলেন, ‘যেভাবে প্রস্তুত হয়ে মেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল, তেমনটি এবার হয়নি। আমরা আশা করব, কাল (বৃহস্পতিবার) থেকে মেলা গুছিয়ে উঠবে। ’

মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক বলেন, ‘মেলায় অব্যবস্থাপনা আছে, সেটা যত দ্রুত দূর হবে ততই মঙ্গল। তবে আমার ভালো লেগেছে ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়। প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর থেকেই মেলায় মানুষ আসছে, এটাই প্রথম দিনের সফলতা। সেই সঙ্গে এবার মেলার স্টলের বিন্যাসটিও সুন্দর হয়েছে। আশা করছি, এবারের মেলা ভালো হবে। ’

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মেলা অগোছালো রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার কারণে অনেকেই শেষ মুহূর্তে স্টল গোছাতে পারেনি। এসব বিষয় আমাদের নজরে পড়েছে। আশা করছি, মেলা পুরোপুরি প্রস্তুত হতে আরো দু-এক দিন লাগতে পারে। ’

নতুন বই : প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলার প্রথম দিনেই প্রকাশিত হয়েছে শতাধিক নতুন বই। তবে প্রথম দিনে মেলার তথ্যকেন্দ্র চালু না থাকায় এর সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে ও প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দিনেই বেশ কিছু ভালো বই চলে আসে পাঠকদের জন্য। মাত্র সোয়া তিন ঘণ্টার জন্য মেলা চলমান থাকলেও অনেক পাঠকই নতুন বইটি প্রথম দিনেই সংগ্রহ করে নিয়েছে।

প্রথম দিনেই মেলায় এসেছে সদ্য প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের অনূদিত গ্রন্থ ‘হ্যামলেট’, বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘মুক্তিযুদ্ধের রচনাসমগ্র’ প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর রচনা ‘আবারো টুনটুনি ও আবারো ছোটাচ্চু’ এনেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। ঐতিহ্য এনেছে শারমিন আহমদের ‘মুক্তির কাণ্ডারি তাজউদ্দীন’ শিরোনামের আলেখ্যগ্রন্থ।

এ ছাড়া হাসান আজিজুল হকের নতুন দুটি বই ‘দুয়ার হতে দূরে’ ও ‘স্মৃতিগদ্য : বন্ধনহীন গ্রন্থি’ প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। আগামী প্রকাশনী থেকে এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’। ঐতিহ্য থেকে এসেছে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণের সংকলন ‘ওঙ্কারসমগ্র’, যার শ্রুতিলিখন ও সম্পাদনা করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।

মেলার প্রথম দিনে এসেছে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস ‘রূপবতী’, কবি মুস্তাফিজ শফির কাব্যগ্রন্থ ‘মায়া মেঘ নির্জনতা’। বই দুটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ।


মন্তব্য