kalerkantho

25th march banner

কালিহাতী উপনির্বাচনে নৌকার প্রার্থী জয়ী

দিনভর ফাঁকা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৬৫%

হায়দার আলী, কালিহাতী থেকে   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দিনভর ফাঁকা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৬৫%

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগদলীয় প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। গতকাল ভোটকেন্দ্র ঘুরে ভোটার উপস্থিতি নগণ্য দেখা গেলেও প্রাপ্ত ভোট ৬৪.৩৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো বড় দলের অংশগ্রহণ ছিল না এ নির্বাচনে। ফলে শুরু থেকেই ভোটারদের মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। নিরুত্তাপ ছিল ভোটের মাঠ। এর মধ্যেও জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে এক প্রিসাইডিং অফিসার গ্রেপ্তার হয়েছেন। জাল ভোট হচ্ছে অভিযোগ এনে এক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

গতকাল ভোট চলাকালে দুপুর ১২টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কোক ডহরা ইউনিয়নের বলধী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে তেমন কোনো ভোটারকে দেখা গেল না। একজন-দুজন করে ভোটার আসতে দেখা গেল। ভোটকেন্দ্রের সামনের মাঠে চেয়ারে বসে আছেন উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল আজিজ। পাশেই পুলিশের অন্য সদস্যরা বসা। একে-অন্যের সঙ্গে গল্প করছেন। ভোটার উপস্থিতি এত কম কেন? কী মনে করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ কর্মকর্তা আজিজ বলেন, ‘শীতের দিন তো, তাই সকালে ভোটার একটু কম। দুপুরের পর ভোটার আসতে পারে। ’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থক রেজাউদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের লোকজন ভোট দিতে না এলেও দলের লোক ঠিকই ভোট দিতে আসবে। সকালে অনেকেরই কাজে থাকে। তাই এ সময় কেন্দ্র একটু ফাঁকা লাগছে। ’ কেন্দ্রটির ১ নম্বর বুথে গিয়ে দেখা গেল আড়াই শতাধিক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে গেছে। ভোটকেন্দ্র ফাঁকা; কিন্তু এত ভোট কিভাবে পড়ল জানতে চাইলে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার আরজিনা বেগম বলেন, ‘একজন একজন করে অনেকেই ভোট দিয়ে গেছেন। এখন একটু লোকজন কম আসছে। ’ তবে পাশের ৩ নম্বর বুথে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট প্রদান করেছে শতাধিক ভোটার। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মোতালেব হোসেন বলেন, অন্য সব ভোটের চেয়ে এবারের ভোট একটু কমই পড়ছে। তবে দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি দাবি করেন।

কেন্দ্রটিতে নৌকার প্রার্থী হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারীর পোলিং এজেন্ট থাকলেও অন্য দুই প্রার্থীর পক্ষে কোনো বুথেই এজেন্ট দেখা যায়নি। তবে বলধী গ্রামের এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই যোগ্য এবং ভালো লোক। তাঁকেই মানুষ ভোট দিচ্ছে। ভোট কাস্টিং বেশি দেখানোর জন্য হয়তো কিছু বাড়তি ভোট পড়ছে। বুঝেনই তো, ভোট কম পড়লে দল আর নেতার সুনাম নষ্ট হবে। ’ তবে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে উত্রাইল বটতলা বাজারের সামনে নৌকার প্রার্থীর কয়েকজন সমর্থক জানান, সোহেল হাজারীর জন্য মানুষ এমনিতেই ভোট দিতে আসছে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে নৌকার সমর্থকরা ভোট দিলেই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট কাস্ট হবে। শুধু বলধী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রেই এমন পরিস্থিতি নয়—উপজেলার বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। তবে দুপুরের পর ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়তে থাকে। নৌকার সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে দেখা গেছে। তবে এ সংখ্যাও ছিল কম। সরেজমিন ঘুরে ভোটকেন্দ্রগুলোর এমন চিত্রই দেখা গেছে।

সহকারী রিটার্নি অফিসার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি কেন্দ্র ছাড়া প্রায় সবগুলোতেই শান্তিপূর্ণ ভোট সম্পন্ন হয়েছে। ভোটার উপস্থিতিও ছিল সন্তোষজনক। ভোট কাস্ট হয়েছে ৬৫ শতাংশ। প্রতিটি কেন্দ্রেই নৌকা মার্কার প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ’

১০৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৬টিতে সুষ্ঠুভাবে ভোট প্রদান সম্পন্ন হলেও জাল ভোটের অভিযোগে একটি কেন্দ্রের ভোটের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। উপজেলার বল্লভবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকার পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মাধব চন্দ্র দাসকে আটক করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত (এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত) কালিহাতী থানায় তাঁকে আটক রাখা হয়। কিন্তু ওই সময় পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি।

অন্যদিকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রার্থী ইমরুল কায়েস (আম) দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে নৌকার পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ইমরুল কায়েস অভিযোগ করে বলেন, উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রেই নৌকার প্রার্থীর লোকজন জাল ভোট দিয়েছে। আর জাল ভোটে সহযোগিতা করেছেন ভোটের দায়িত্বে থাকা লোকজনই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জাল ভোটের কারণে একজনকে গ্রেপ্তারও করেছেন। কাদের সিদ্দিকীর কয়েকজন সমর্থক ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা কম থাকলেও ভোট কাস্ট দেখাচ্ছে ৬৫ শতাংশ। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সারা দিন মাছি মেরে সন্ধ্যায় এমন খবর হাস্যকর ছাড়া আর কী?’ পাইকরা ইউনিয়নের ভোটার নজরুল ইসলাম, মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকেই বলেন, ‘কালিহাতীর ৮০ শতাংশ ভোটার নৌকার, নৌকার সমর্থকরা ঠিকই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছে। কোনো জাল ভোট হয়নি। এখানে শক্ত প্রার্থী নেই। আমাদের বিজয় নিশ্চিত জেনেও আমরা কেন জাল ভোট দিতে যাব?’

সকালেই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দুই প্রার্থী বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) আতাউর রহমান খান (টেলিভিশন) ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ইমরুল কায়েসের (আম) কোনো এজেন্ট কেন্দ্রগুলোতে নেই। সব কেন্দ্রেই নৌকার পক্ষে ব্যাজ লাগিয়ে এজেন্টদের ঘুরতে দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ১০টায় পাইকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে ভোট পড়েছে ৫৮০টি। ওই কেন্দ্রে মোট ভোট রয়েছে দুই হাজার ৭৮৩টি। আর দুপুর সাড়ে ১২টায় গিয়ে দেখা যায়, কাজিবাড়ী মাদ্রাসা কেন্দ্রের মোট দুই হাজার ৩৫৮ ভোটের মধ্যে ভোট প্রদান করা হয়েছে এক হাজার ৫৯টি। দুপুর দেড়টায় গিয়ে দেখা যায়, সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর কেন্দ্র আলাউদ্দিন সিদ্দিকী মহাবিদ্যালয়ে মোট ভোটার তিন হাজার ৫০৭ আর ভোট পড়েছে এক হাজার ৭০১। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, সকালে ভোটার উপস্থিতি বেশি ছিল, তাই এত ভোট পড়েছে। নাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় সকালেই নৌকা মার্কার লোকজন ভোট দিয়ে এগিয়ে রেখেছে তাদের প্রার্থীকে। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও তারা ঠিকই ভরে রেখেছে বাক্স। ’

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রার্থী ইমরুল কায়েস অভিযোগ করে বলেন, দুপুর ১২টার দিকে এলেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, নৌকার সমর্থকরা সারি বেঁধে বিনা বাধায় জাল ভোট দিচ্ছে। বাধা দিতে গেলে তাঁকে তারা লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে বলেও তিনি দাবি করেন। ওই ঘটনা পুলিশকে জানালেও তারা এ ব্যপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে তিনি পুলিশের সহায়তায় কেন্দ্র ত্যাগ করেন বলে জানান। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে তিনি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

উপনির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার তাজুল ইসলাম আরো বলেন, ‘এলেঙ্গার বল্লভ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শামসুল হক কলেজের প্রভাষক মাধব চন্দ্র দাসকে আটক করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রের দুই হাজার ৭৪৩ ভোট বাতিল করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। কমিশন অনুমতি দিলেই মামলা করা হবে। ’

কালিহাতী উপজেলার দুটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নে মোট ভোটার রয়েছে দুই লাখ ৯০ হাজার ৫৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার এক লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ এবং পুরুষ ভোটার এক লাখ ৪৩ হাজার ২৫৫ জন। গতকাল ভেট গণনা শেষে দেখা যায় নৌকা মার্কার প্রার্থী হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী পেয়েছেন এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ ভোট। পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রার্থী ইমরুল কায়েস (আম) ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও পেয়েছেন এক হাজার ৬৯৬ ভোট। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) প্রার্থী আতাউর রহমান খান (টেলিভিশন) পেয়েছেন এক হাজার ৩২০ ভোট।


মন্তব্য