kalerkantho


অ্যাটর্নি জেনারেল বরখাস্ত

ট্রাম্পের অভিবাসননীতির সমালোচনায় ওবামা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ট্রাম্পের অভিবাসননীতির সমালোচনায় ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়ক নির্বাহী আদেশের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দায়িত্ব ছাড়ার পর এই প্রথম মুখ খুললেন তিনি।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যে বিক্ষোভ সমাবেশ চলছে তার পক্ষে মত প্রকাশ করে ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ যখন ঝুঁকির মুখে পড়ে তখন ঠিক এই প্রতিক্রিয়াই প্রত্যাশিত। এদিকে নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর বিরোধিতাকারীদের ছাড় দিতে নারাজ। বরং সমালোচকদের একহাত নিয়ে তিনি তাঁর আদেশের বৈধতার প্রশ্ন তোলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করেছেন। ওবামার আমলে নিয়োগ পাওয়া ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল স্যালি ইয়েটসকে গত সোমবার রাতে বরখাস্তের আদেশ দেন।

ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে ওবামা বলেছেন, নাগরিকরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছে। সমাবেশ করছে। তাদের বক্তব্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন এমনটাই হওয়া উচিত।

স্থানীয় সময় গত সোমবার বারাক ওবামার মুখপাত্র কেবিন লুইস বলেছেন, অভিবাসী নিষেধাজ্ঞায় ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বারাক ওবামার নির্বাহী আদেশের অনুরূপ—এমন প্রচারণা চলছে। ট্রাম্পের দাবি, ওবামা ২০১১ সালে বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। এ রকম প্রচারণায় আহত হয়েছেন ওবামা। তাঁর মুখপাত্র বলেন, ২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্বাহী আদেশে শুধু ইরাকি শরণার্থীর কথা বলা হয়েছিল। তবে সেখানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। ওবামা কোনো মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণে বিশ্বাসী নন।

কেবিন লুইস বলেন, ওবামা তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে নাগরিকদের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন করা নয়; নাগরিকদের সক্রিয় থাকতে হবে। ওবামার দৃষ্টিতে এটিই হলো সেই নাগরিক সতর্কতা। রীতি অনুযায়ী, সাবেক প্রেসিডেন্টরা সাধারণত উত্তরসূরির নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। ওবামার পূর্বসূরি জর্জ বুশ তো নীরবতা পালনের দিক থেকে রীতিমতো নজির সৃষ্টি করেছেন। ওবামার আট বছরের শাসন নিয়ে কখনোই কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। তবে বিদায়ের আগে ওবামা বলেছিলেন, ট্রাম্প আমেরিকান মূল্যবোধকে বিপদে ফেলছেন মনে হলে দায়িত্ব ছাড়ার পরও কথা বলবেন।

গত শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস দাবি করেছে, ট্রাম্পের আদেশ বিতর্কিত। এতে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর লঙ্ঘন হয়েছে। প্রথম সংশোধনীতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের গভর্নর জে ইন্সলি বলেছেন, তিনিও একটি মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কারণ ধর্ম বা জন্মের ভিত্তিতে কোনো মানুষের প্রতি সরকার বিদ্বেষ দেখাতে পারে না।

এই বিতর্ক-বিক্ষোভ সামাল দিতে মুখ খুলেছেন ট্রাম্পও। তিনি দাবি করেন, আদেশ জারি করার পর প্রথম দুই দিনে তিন থেকে সোয়া তিন লাখ লোক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১০৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের একটি সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগে থেকে কোনো সতর্কতা না দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে সতর্কতা জারি করা হলে এর মধ্যেই বাজে লোকরা আমাদের দেশে ঢুকে পড়ত। ’

তবে নোটিশ না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পথে উড়াল দেওয়া লোকজন যে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে তা বলাই বাহুল্য। এলতিরমিজি মোহাম্মদ ৩৪ বছর বয়সী একজন সুদানি চিকিৎসক। তিনি আটলান্টিক মেডিক্যাল সেন্টারে তিন বছর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জর্জিয়ায় স্থায়ী চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর দেশে ফিরেছিলেন বেড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এখন সুদানের রাজধানী খার্তুম বিমানবন্দরে আটকে গেছেন। কাতার এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ধরে জর্জিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। বলছিলেন, ‘আমি একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় গৃহহীন ও দরিদ্র আমেরিকানদের জন্য কাজ করতে চেয়েছিলাম। এখন এখানে আটকে গেছি। ’

তবে এসব বিড়ম্বনা নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন ট্রাম্প। বরং তাঁর জারি করা আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। সোমবার রাতে স্যালি ইয়েটসকে বরখাস্তের আদেশ আসে, যিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন আগের প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে। ট্রাম্পের ওই আদেশ কার্যকর করতে বিচার মন্ত্রণালয়কে নিষেধ করেন ফেডারেল সরকারের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা ইয়েটস। তিনি বলেন, ট্রাম্পের আদেশ আইনসম্মত কি না—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

ইয়েটসের ওই বক্তব্যের পর টুইটারে ট্রাম্পের তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ওবামার অ্যাটর্নি জেনারেল আছে। সিনেট কমিটিগুলোতে থাকা ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যরা ‘নিখাঁদ রাজনৈতিক কারণে’ তাঁর নিয়োগ করা কর্মকর্তাদের মনোনয়নে দেরি করিয়ে দিচ্ছে। এরপর হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইয়েটস বিচার বিভাগের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছেন। ইয়েটসের জায়গায় ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভার্জিনিয়ার ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি ডানা বোয়েন্তেকে।

নিউ ইয়র্কের ধনকুবের ট্রাম্প ২০০৪ সালে এনবিসি টেলিভিশনে ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ নামে একটি রিয়ালিটি শো শুরু করেন, যেখানে প্রতিযোগীদের পুরস্কার ছিল ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপকের চাকরি। ওই সময় ট্রাম্পের কণ্ঠের ‘ইউ আর ফায়ারড’ ডায়ালগটি বেশ আলোচিত হয়ে ওঠে। গত ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে একের পর এক নির্বাহী আদেশে বিশ্বজুড়ে তুলকালাম বাধিয়ে দেওয়ার পর এই প্রথম কাউকে ‘ফায়ার’ করলেন ট্রাম্প।  

 প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ট্রাম্প নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে জেফ সেশনসকে মনোনীত করেন। কিন্তু সিনেট তাঁকে এখনো অনুমোদন না দেওয়ায় ইয়েটসকেই ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আদেশ বিষয়ে বিচার বিভাগের কর্মীদের কাছে লেখা ইয়েটসের একটি চিঠি সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ আমি দায়িত্বে আছি, ততক্ষণ প্রেসিডেন্টের ওই নির্বাহী আদেশের সমর্থনে বিচার বিভাগ আদালতে লড়বে না। ’

এদিকে ট্রাম্পের আদেশের সঙ্গে ‘ভিন্নমত’ প্রকাশ করে শতাধিক কূটনীতিক একটি চিঠি পাঠাচ্ছেন বলে জানা গেছে। চিঠির খসড়ায় কূটনীতিকরা বলেছেন, অভিবাসী ও শরণার্থী আটকাতে ট্রাম্পের আদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে মোটেও নিরাপদ রাখবে না। এই আদেশ ‘আমেরিকানসুলভ’ নয় এবং মুসলিম বিশ্বের কাছে ভুল বার্তা পাঠাবে। তবে কতজন কূটনীতিক এই চিঠিতে সই করবেন সে সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।


মন্তব্য