kalerkantho

26th march banner

কিডনি প্রতিস্থাপন

‘দালালি’ ভয়ে ডাক্তাররা চিকিৎসায় গতি নেই

তৌফিক মারুফ   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘দালালি’ ভয়ে ডাক্তাররা চিকিৎসায় গতি নেই

২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কালে জয়পুরহাট ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিডনি বেচাকেনা নিয়ে দালালচক্রের তত্পরতা ছিল ব্যাপক আলোড়িত খবর। এখন সেই অপতত্পরতার খেসারত দিচ্ছে কিডনি রোগীরা। কিডনি প্রতিস্থাপনে ভয় কাটছে না চিকিৎসকদের। বিকল্প ব্যয়বহুল ডায়ালিসিস চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে রোগীর স্বজনরা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে কিডনি বিকল হওয়ার শঙ্কা। ৭৫ শতাংশ মানুষ নষ্ট হওয়ার আগে টের পায় না নিজের কিডনির সমস্যার বিষয়টি। কিডনি বিকল হয়ে দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে। আর প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে।

অপেক্ষাকৃত কম ব্যয় ও সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে কিডনি প্রতিস্থাপনই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আইনি জটিলতা ও জনসচেতনতার অভাবে দেশে কিডনি বিকল হওয়া প্রায় ৯৮ শতাংশ রোগীই ওই চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না। তারা ধুঁকতে ধুঁকতে একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

কিডনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ব্রেন ডেথ’ মানুষের কিডনিদানের মাধ্যমে খুব সহজেই বাঁচিয়ে রাখা যায় হাজারো মানুষকে। এ জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা আর আইনি জটিলতা দূর করা। বিশেষ করে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন (সংশোধনী)-২০১৬ প্রণয়ন ও কার্যকর করার দিকে তাকিয়ে আছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা কিডনি ব্যবসাসংক্রান্ত অপবাদ ও আইনি ঝামেলা এড়াতে কিডনি প্রতিস্থাপনে সহসা আগ্রহী হচ্ছেন না। খুব ধীরগতিতে ঝুঁকি নিয়ে দুই-চারটি প্রতিস্থাপন হচ্ছে। এদিকে মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন (সংশোধনী)-২০১৬-এর খসড়া অনেক দিন ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। যত দিন এটি আইনে পরিণত না হবে তত দিনে সমস্যা কাটবে না। ভয় কাটবে না চিকিৎসকদেরও। ’

অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের জন্য ১৯৯৯ সালে জাতীয় সংসদে একটি আইন প্রণয়ন হয়। এখন পর্যন্ত সেটিই বলবৎ আছে। কিন্তু ওই আইনের ফাঁকফোকর গলে এক শ্রেণির দালাল কিডনি নিয়ে অসাধু ব্যবসার সুযোগ নেয়। তাই আইনটি সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আগের আইনে কিছু সংশোধন ও সংযোজন-বিয়োজন করে নতুন একটি খসড়া মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। ’

চিকিৎসকরা জানান, দেশে বিপুলসংখ্যক কিডনি রোগী থাকলেও মাত্র ৪ শতাংশের ডায়ালিসিসের ব্যয় বহনের সামর্থ্য আছে। দেশে বর্তমানে ৪৪টি ডায়ালিসিস সেন্টার আছে। আর কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন বা কিডনি প্রতিস্থাপন সেন্টার আছে মাত্র আটটি। কিডনিসহ মানুষের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর চাইলেই কিডনি বা লিভার দেওয়া যায় না। প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ফলে কিডনি প্রতিস্থাপন এ দেশে বেশ জটিল ও কঠিন। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মানুষের দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যদিও দেশে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন হয় ১৯৮২ সালে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ও ইউরোলজি হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. জামানুল ইসলাম ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বে এখন পর্যন্ত দুই প্রক্রিয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপন হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে ব্রেন ডেথ বা নিশ্চিত মৃত্যুর আগমুহূর্তে উপনীত হওয়া কোনো ব্যক্তির কিডনি এবং আরেকটি হচ্ছে সুস্থ-সবল স্বজনের স্বেচ্ছায় কিডনি দান করা। দেশে এখন পর্যন্ত কেবল স্বজনের কিডনিদানের আইনগত পদ্ধতিটিই চালু। তবে কোনো রোগীর দুটি কিডনি অকেজো হয়ে গেলে কিডনি প্রতিস্থাপনের আগে তাকে বিকল্প পন্থায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় ডায়ালিসিসের। ’

ডা. জামানুল জানান, দান করা কিডনি না পেলে বা অন্যান্য উপাদানে মিল না হলে রোগীকে বাঁচাতে চিকিৎসকের অগোচরেই অবৈধ পথে পা বাড়ায় স্বজনরা। আর তা করতে গিয়ে তারা পড়ে দালালচক্রের খপ্পরে। ওদিকে কিডনি নিয়ে দালালির ভয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের ভয় দূর না হওয়ায় গতি ফিরছে না কিডনি প্রতিস্থাপনকাজে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) গত সোমবার এক সেমিনারেও কিডনি প্রতিস্থাপনে দালালি তত্পরতা নিয়ে চিকিৎসকদের ভয়-ভীতির কথা উঠে আসে। গত ৩৫ বছরে ৫০০ রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করায় এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও তাঁদের ভয়-ভীতির কথা তুলে ধরে অবিলম্বে সংশোধিত আইনের খসড়া দ্রুত আইনে পরিণত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ব্রেন ডেথে থাকা রোগীদের কিডনিদানে সচেতনতা বাড়ানোরও তাগিদ দেন তাঁরা।

অনুষ্ঠানে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, চক্ষুদানের মতো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে ব্রেন ডেথে থাকা রোগীদের কিডনিদানে স্বজনদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রবীণ কিডনি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওহাব বলেন, ‘রোগী বাঁচানো একজন চিকিৎসকের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু তা করতে গিয়ে চিকিৎসকের আইনগত, সামাজিক-পারিবারিক কিংবা মানসিক হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি দূর করতে হবে। চিকিৎসকরা ভয় কাটাতে না পারলে রোগীর সেবা দেবেন কিভাবে?’

আরেক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সালাম অনুষ্ঠানে বলেন, ব্রেন ডেথ ব্যক্তির কিডনিদান কার্যক্রম পাশের দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জোরালোভাবে কার্যকর রয়েছে। এমনকি অনেক দেশে আইন করা আছে। ফলে সেসব দেশের সরকার ওই রোগীকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের আগে তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে তা অন্য মানুষকে বাঁচানোর কাজে লাগায়।

অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আলী আসগর মোড়ল, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আব্দুল্লাহ আল হারুন, ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সাজিদ হাসান, কিডনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শহিদুল ইসলাম সেলিম, শিশু কিডনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান, অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিকসহ অন্যরা।


মন্তব্য