kalerkantho


ইউনেসকোকে বোঝাতে এবার প্যারিস যাচ্ছে প্রতিনিধিদল

আরিফুর রহমান   

২৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ইউনেসকোকে বোঝাতে এবার প্যারিস যাচ্ছে প্রতিনিধিদল

সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে সরকার ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে চলতে থাকা বিতর্ক আরো উসকে দিল জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেসকোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন; যে প্রতিবেদনে সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে সেটিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্ব সংস্থাটি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হওয়া না-হওয়া নিয়ে সরকার ও ইউনেসকোর মধ্যে চলছে চিঠি চালাচালি, যুক্তি-পাল্টাযুক্তি। মাস দুয়েক ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলতে থাকা চিঠি চালাচালির পর এবার সশরীরে তাদের পক্ষের যুক্তির দলিল-দস্তাবেজসহ ইউনেসকোর সদর দপ্তর প্যারিসে যাচ্ছে সরকারের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। উদ্দেশ্য, বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হবে না তা যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করে আসা। একই সঙ্গে আগামী বছর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের ৪১তম বৈঠকে সুন্দরবনকে যাতে ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা না দেওয়া হয় বা ওই সম্মেলনে বিষয়টি যাতে উত্থাপন না করা হয়, সে বিষয়ে অনুরোধ জানানো।

প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় চার দিনের সরকারি সফরে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র ও ইউনেসকোর সদর দপ্তর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উদ্দেশে উড়াল দেবে প্রতিনিধিদল। এই সফরে ইউনেসকো ও বিশ্ব ঐতিহ্য সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে প্রতিনিধিদল। ২৮ অক্টোবর তাদের ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুত্ বিভাগের পাওয়ার সেলের পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ, বন অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) উপনির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান।

জানতে চাইলে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল রিয়াজউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্যারিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেছি। তবে এখনো আলোচ্যসূচি হাতে পাইনি। ফলে বলতে পারছি না কী কী বিষয় নিয়ে ইউনেসকো ও বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে। প্যারিস থেকে ফিরে এলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

খুলনা বিভাগের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি চাকরির সুবাদে ৩১ বছর ধরে সুন্দরবনকে দেখে আসছি। এটি আমাদের গর্ব। সুন্দরবনের কোনো বিপদ হোক সেটি কখনোই চাইব না। সুন্দরবনকে যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা বিপন্ন ঘোষণা না করা হয়, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব। তাদেরকে বোঝাব।’

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ছয় বিশেষজ্ঞকে ইউনেসকো সদর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। ছয়জন বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ। প্রতিনিধিদল রামপাল নিয়ে এরই মধ্যে সরকারের সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। রামপাল নিয়ে ইউনেসকো যেসব ঝুঁকি ও আশঙ্কার কথা বলেছে, সেগুলোর পাল্টা যুক্তি ও নিজেদের হাতে থাকা যুক্তি বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ তৈরি করেছিল পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস)। সে ইআইএ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইউনেসকো বলেছিল, ইআইএ প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। সেখানে যথেষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। ইউনেসকোর এই প্রশ্নের জবাব দিতে প্যারিস যাচ্ছেন সিইজিআইএসের উপ-নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান। তিনি ইউনেসকো প্রতিনিধিদলের সামনে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করবেন যে ইআইএ প্রতিবেদনটি ছিল আন্তর্জাতিক মানের। সেখানে কোনো ত্রুটি নেই। দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছে সিইআইজিএস।

সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজে হাত দেয় সেই ২০১০ সালে। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়বে—এমন যুক্তি দেখিয়ে পরের বছর থেকে আন্দোলন করে আসছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে গত ছয় বছরে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ অনেক এগিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দেশি-বিদেশিসহ বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র আপত্তি আসার পর গত বছর জার্মানির বনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৯তম অধিবেশনে সুন্দরবন ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। সে সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২২ মার্চ তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের প্রতিনিধি নাওমি ডোয়াক, মিজুকি মুরাই ও বিশ্ব ঐতিহ্য সেন্টারের ফানি অ্যাডলফাইন ডাউবিরি। প্রতিনিধিদলের সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশ ও সুন্দরবনের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সেটি নিরূপণ করা। পাঁচ মাস বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি গত আগস্টে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হবে। রামপালে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে অন্যত্র তা সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল ওই প্রতিবেদনে। সরকারের পক্ষ থেকে জবাব পেলে এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষের তথ্য-উপাত্ত সমন্বয় করে সেটি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছিল ইউনেসকো। ইউনেসকোর ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ অক্টোবর সরকারের তরফ থেকে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয় ইউনেসকোর কাছে। সেখানে বলা হয়, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। সুন্দরবনেরও কোনো ক্ষতি হবে না। সরকারের কাছ থেকে জবাব পাওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রতিবেদনটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিনিধিদলের একজন গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউনেসকো গত ১৮ অক্টোবর তাদের ওয়েবসাইটে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, সেখানে সরকারের সব তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করা হয়নি। তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়টি জানতে চাওয়া হবে—কেন সব তথ্য-উপাত্ত যোগ করা হয়নি। ইউনেসকো ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছে, সেগুলোর জবাব দেওয়া হবে। আর এসব জবাব দেওয়া হবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে। ইউনেসকো ও বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের জানানো হবে, রামপালে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এতে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। প্রতিনিধিদল আশা করছে, তাদের এই সফরের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন নিয়ে ইউনেসকোর ভয় ও আশঙ্কা কাটবে। এ ছাড়া আগামী বছর বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের অধিবেশনে সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে যাতে ঘোষণা না করা হয় তা বিবেচনারও অনুরোধ থাকবে।



মন্তব্য