kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বায়তুর রউফ মসজিদ

স্থাপনাশৈলী দেখে মুগ্ধ অতিথিরা

নওশাদ জামিল   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



স্থাপনাশৈলী দেখে মুগ্ধ অতিথিরা

গতকাল সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা বায়তুর রউফ মসজিদ দেখতে যান। এ সময় স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর উত্তরার আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে সরু পিচঢালা পথ গেছে দক্ষিণখানের দিকে।

সরু পথটি ধরে যেতে থাকলে রেললাইন। রেললাইন পার হয়ে সামান্য দূরে ফায়েদাবাদ। এরপর খানিকটা মেঠোপথ পাড়ি দিলেই চোখে পড়বে নান্দনিক স্থাপনাশৈলীর বায়তুর রউফ মসজিদ। কিছুদিন আগে স্থাপত্যের নোবেলখ্যাত ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ পায় এই মসজিদটি। এরপর থেকে মসজিদটির নামডাক ছড়িয়ে পড়ে, সুনাম কুড়ায় মসজিদটির স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। তিনি একা নন, গাইবান্ধায় ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার স্থাপত্যের জন্য কাসেফ মাহবুব চৌধুরীও এ পুরস্কার পেয়েছেন। এবারই প্রথম এই দুই বাংলাদেশি এ সম্মাননা পেয়েছেন। তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর অন্তর এই পুরস্কার দিয়ে থাকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্টদূতসহ একদল বিদেশি অতিথি দেখতে যান অনিন্দ্য সুন্দর এই স্থাপনা। তাঁদের স্থাপনা ঘুরে দেখান স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। মসজিদের স্থাপনাশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন দেশ-বিদেশের অতিথিরা।

মসজিদটি দেখতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গী হয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট, ফরাসি রাষ্ট্রদূত সোফি আবের, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত ওয়ানজা ক্যাম্পোস নবরেগা ও মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার নূর আশিকিন বিনতে মোহ্ তাইব। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক মিশনের আবাসিক কূটনৈতিক প্রতিনিধি মুনীর এম মেরাইলি। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের (একেডিএন) প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাজরিন রহমান।

মসজিদ পরিদর্শনকালে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানালেন নিজের মুগ্ধতার কথা। বললেন, ‘এ ধরনের স্থাপত্য বিরল। দারুণ লাগছে এখানে এসে। সারা বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে আন্দোলন করছে, তখন এ ধরনের পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য সত্যিই প্রশংসনীয়। ’

আগা খান পুরস্কার দেশের স্থাপনাশিল্পে উৎসাহ দেবে উল্লেখ করে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আরো বলেন, ‘দেশের দুটি স্থাপনা আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার পাওয়া দেশের জন্য অনন্য একটি সম্মান। এটি দেশের স্থাপত্যকলার চর্চাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। তরুণ প্রজন্ম এ থেকে অনুপ্রেরণা পাবে। ’

মসজিদ ঘুরতে ঘুরতেই মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেন, ‘বাংলাদেশে বিশ্বমানের স্থপতিবিদ রয়েছেন। তাঁদের কাজ সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। আগা খান পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী সত্যি দারুণ এবং অভিনব। এমন সুন্দর স্থাপত্য খুব একটা দেখা যায় না। ’ 

গতকাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, স্থাপত্যশৈলীর জন্য এ মসজিদের ভেতরে ও চারপাশে যেমন ঝকঝকে রোদের দেখা মেলে, তেমনি ঝমঝম বৃষ্টিতে থাকে দারুণ বর্ষার আবহ। বিশেষ ব্যবস্থার জন্য সর্বদা থাকে বাতাস চলাচল। ফলে তাপমাত্রা থাকে নিয়ন্ত্রিত। প্রাকৃতিক আলো পাওয়ার জন্য ছাদ ও পাশ থেকে আছে চমৎকার ব্যবস্থা। আটটি কলামের ওপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে। বাইরে লাল ইটের কারুকাজ। ছাদ ও চারপাশ থেকে আলো পড়ে মসজিদের ভেতরে তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক আলোকোজ্জ্বল ব্যবস্থা। মসজিদে কোনো গম্বুজ বা মিনার নেই। ১১ কাঠা জায়গার ওপর এটি দাঁড়িয়ে। একতলা এ মসজিদের সঙ্গে লাগোয়া গ্রন্থাগার। আছে ওজুর ব্যবস্থা।

মসজিদটির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় বাতাস চলাচলব্যবস্থা ও আলোর চমৎকার বিচ্ছুরণ পুরো পরিবেশের মধ্যেই ছিল অন্যরকম। মসজিদটির বিশেষত্ব হলো—পুরো পরিবেশটিই প্রাকৃতিক আবহে ঘেরা।

স্থানীয় মুসল্লি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এই মসজিদে নামাজ পড়া বেশ আরামদায়ক। এখানে নামাজ পড়ার সবচেয়ে ভালো দিক এখানে গরম লাগে না। ফলে বিদ্যুিবভ্রাটের সময়ও এখানে সামাজ পড়তে সমস্যা হয় না। এ ছাড়া প্রতি ওয়াক্তের নামাজের সময় বাইরে থেকে ভিন্ন রকমের আলো আসে। ’

মসজিদের ইমাম দ্বীন ইসলাম জানান, ‘এই মসজিদে প্রতি জামাতে ৪০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। এবার ঈদুল আজহায় এখানে ছয় শতাধিক মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। এ ছাড়া প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। ’ 

মসজিদের স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম মসজিদটির বিশেষত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘মসজিদটির নকশা করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। প্রচলিত মসজিদগুলো থেকে আলাদাভাবে। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের দিকটি মাথায় রেখে এর নকশা করা হয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতিকেও মাথায় রাখা হয়েছে। নকশায় সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীরও কিছুটা প্রভাব রয়েছে। ’

জানা যায়, এবার আগা খান স্থাপত্য পুরস্কারের জন্য ৩৪৮টি প্রকল্প জমা পড়ে। সেখান থেকে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ৯ জন স্থাপতি ও নন্দনতত্ত্ববিদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারকমণ্ডলীর বিবেচনায় ছয়টি প্রকল্প পুরস্কৃত হয়। সারা বিশ্ব থেকে বাছাই করা মোট ১৯টি স্থাপনার মধ্যে পাঁচ দেশের ছয়টি নকশা চূড়ান্তভাবে পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে কেবল বাংলাদেশেরই দুটি স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া চীনের পেইচিংয়ের হুটং চিলড্রেনস লাইব্রেরি, ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের জনসমাগম ও বিনোদনকেন্দ্র সুপারকিলেন, ইরানের তেহরানের দুটি পার্কের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী তিনস্তরের তাবিয়ান পেডেস্ট্রিয়ান ব্রিজ ও লেবাননের বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ইসাস ফেয়ারস হাউস এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশের তিনটি স্থাপত্যকর্ম এই পুরস্কার জিতলেও সেগুলোর স্থপতি ছিলেন বিদেশি। তিনবার পুরস্কার জিতেছে বাংলাদেশের তিনটি স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও রুদ্রপুর স্কুল। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম সার্বিক অবদানের জন্যও এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। আগামী নভেম্বরে আবুধাবির ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আল জাহিলি ফোর্টে এবারের বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ইউএস ডলার।


মন্তব্য