kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত,সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করার তাগিদ

আরিফুর রহমান   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত,সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করার তাগিদ

তিন দিনের ঢাকা সফরে এসে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়ে গেছেন, তাতে বিস্মিত দেশের পরিবেশবিদরা। তাঁরা বলছেন, ২০১২ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো দেশ বা সংস্থা থেকে ঋণ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

বলা হয়েছিল, শুধু অনুদান নেওয়া হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত বিশ্বের কাছে অনুদান পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে সরকার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। জিম ইয়ং কিমের ঋণ দেওয়ার ঘোষণার ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো দেশ বা সংস্থার কাছে অনুদান চাওয়ার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলবে বলেও মত তাঁদের। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের এই প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ বলেও মত দেন অনেকে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত বছর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ঋণ নিতে কোনো অসুবিধা নেই।

বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে গত শনিবার তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের দেখতে বরিশালেও যান তিনি। তিন দিনের অভিজ্ঞতা জানাতে মঙ্গলবার বিকেলে সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হবে। এই অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় খরচ হবে। তাঁর এই ঘোষণা শুনে বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের যতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ দেশ আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম সবার আগে। অথচ এর জন্য বাংলাদেশ নয়, দায়ী উন্নত বিশ্ব। তারাই কার্বন নিঃসরণ করে। উন্নত বিশ্বের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তারা বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অনুদান দেবে। কিন্তু এর বদলে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে উন্নত বিশ্ব ও সংস্থাগুলো। এই টাকা ঘুরেফিরে পরামর্শক, কারিগরি সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের নামে নিজেরাই নিয়ে যাবে।

জানতে চাইলে জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসিসি) সদস্য আহসান উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অভিযোজন ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। অবশেষে তারা ফল পেয়েছে ২০০ কোটি ডলার ঋণ ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন খাতে অনুদান পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছি। কিন্তু দেশের একটি মহল অনুদানের পরিবর্তে ঋণ পেতে বেশি আগ্রহী। কারণ এতে তাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিদেশে ঘোরাঘুরি করা যাবে। বিশ্বব্যাংকের এই ২০০ কোটি ডলার যদি ঋণ হিসেবে নিই, তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রমাণ করব যে ঋণ নিয়ে অভিযোজন খাতে খরচ করতে চাই। আমাদের সক্ষমতা আছে ঋণ নেওয়ার। তখন বিশ্বব্যাংকও সারা বিশ্বে বলে বেড়াবে, বাংলাদেশ ঋণ নিচ্ছে, তোমরাও নাও। এতে যেসব দেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে, তারাও বিপদে পড়ে যাবে। ’ আহসান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিরই অংশ। এর মাধ্যমে তারা তাদের ব্যবসাকে আরো বিকশিত করার সুযোগ পাবে।

এ প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্য জানতে চাইলে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার নিরুপায় হয়ে ঋণের দিকে ঝুঁকছে। কারণ অনুদান পাওয়া ক্রমেই জটিল হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি ঋণ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অনুদান দেওয়ার কথা বলেছিল, তারা তাদের সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয় সূত্র বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে এই ২০০ কোটি ডলার ঋণ খরচ হবে। এর সুদের হার হবে ০.৭৫ শতাংশ। ছয় বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ বাংলাদেশ ৩২ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। এর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিসিসিআরএফ নামে একটি ফান্ড খোলা হলেও সেটি পরে বন্ধ করে দেয় বিশ্ব সংস্থাটি।

জানতে চাইলে জার্মানভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) বাংলাদেশ শাখার জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন সেলের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জাকির হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে সরকার তাদের নৈতিক ভিত্তি থেকে সরে এসেছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। কারণ সরকার একটা সময় পর্যন্ত ঋণ না নেওয়ার ব্যাপারে অনড় ছিল।

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এই ঋণের মধ্য দিয়ে তাদের পরামর্শক এ দেশে আসবে। প্রযুক্তি আসবে। ঠিকাদার নিয়োগ হবে। এটি বিশাল বাণিজ্য। এই বাণিজ্যতে আমাদের মন্ত্রী-আমলারা জড়িত। কারণ এই ঋণে সুবিধা বেশি। ফলে তাঁদের অনুদানের দিকে তেমন আগ্রহ নেই। ’ বাংলাদেশের অর্থনীতির এখন যে আকার তাতে এই ২০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও মত দেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বের কাছ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলায় ১৩ কোটি ডলার অনুদান পেয়েছে।


মন্তব্য