kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুরান ঢাকায় অনিয়মের সাক্ষী এক বহুতল ভবন

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পুরান ঢাকায় অনিয়মের সাক্ষী এক বহুতল ভবন

আরমানিটোলার এই ভবনটি ৯ তলার অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে ১১ তলা। অনুমোদনহীনভাবে পার্কিংস্থলে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট ও গুদাম। ছবি : কালের কণ্ঠ

ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী বহুতল ভবনের নিচতলায় গ্যারেজ রাখার কথা থাকলেও সেখানে দোকান ও গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবনের চারপাশে নিয়মানুযায়ী কোনো জায়গাও ছাড়া হয়নি।

শুধু তাই নয়, ৯ তলার অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১১ তলা ভবন। বিষয়টি নজরে আসার পর রাজউকের পক্ষ থেকে পর পর তিনটি নোটিশ দেওয়া হয়, কিন্তু ভবন মালিক তা আমলে নেননি। সর্বশেষ ২০১৪ সালে ভবনটিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রাজউক। কিন্তু ভবন মালিক আবারও পুনর্নির্মাণ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন ভবনটি। রাজধানীর পুরান ঢাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এমন একটি বহুতল ভবন অনিয়মের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজউকের অথরাইজড অফিসার জেড এম শফিউল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীতে যেখানে রাজউকের নিয়ম ভঙ্গ করে ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানেই আমরা আইনি ব্যবস্থাসহ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। পুরান ঢাকার এ ভবনেও আমরা ২০১৪ সালে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। ৯ তলার স্থলে সেখানে ১১ তলা করার পর অবৈধ অংশ ভেঙে দিয়েছি। নিচতলায় গ্যারেজ থাকার কথা থাকলেও সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয়েছিল। তাও আমরা উচ্ছেদ করেছি। কিন্তু বাড়ির মালিক সব কিছু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমরা এবার এ ভবনে চূড়ান্ত অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ’

সরেজমিনে দেখা যায়, ১০৪/১ আরমানিটোলার কে পি ঘোষ স্ট্রিট রোডের পাশে বিশাল এ ভবন। ভবনের নিচে গ্যারেজ থাকার কথা থাকলেও সেখানে দেখা যায় কমপক্ষে ১০টি দোকান আর আটটি গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছে। হাসান এন্টারপ্রাইজ, মিম এন্টারপ্রাইজ, সুমন পেপার হাউস, আল মদিনা প্লাস্টিক, মাছুম পেপার হাউস, খান ট্রেডিংসহ আরো কিছু গোডাউন ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। আর বাকিগুলো ভাড়ার জন্য টু-লেট টাঙানো হয়েছে। বহুতল ভবন করলে নিময়ানুযায়ী ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ জায়গা ছাড়ার কথা থাকলেও এ ভবন মালিক তা মানেননি। এমনকি নিচের অংশে ভবনের পিলার রাস্তা ঘেঁষে তুলে ওপরে গিয়ে রাস্তার অংশে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ভবনটি অন্য ভবনগুলোর গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনে ঢুকতে একটি সরু প্রবেশ পথ রাখা হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ভবনের নিচের এক দোকানি জানান, তাঁরা দোকান নেওয়ার পর রাজউক থেকে একবার তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু মালিক আবার তাঁদের আশ্বস্ত করে দোকান ভাড়া দেন। এ ভবনের  চারপাশে কোনো জায়গাই খালি রাখা হয়নি। এ ভবনের কারো কাছে যে গাড়ি আসে; পার্কিং না থাকায় সেগুলো রাস্তায় রাখা হয়। ফলে সরু রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজনের ভোগান্তি বেড়ে যায়।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, আরমানিটোলা ১০৪/১ নম্বর ভবনের মালিক মো. হাবিবুর রহমান গং। তিনি রাজউক থেকে ৯ তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে ১১ তলা নির্মাণ করেন। এ বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার ভবন মালিককে নোটিশ দেন। নোটিশে বলা হয়, ‘সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভবনটি অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য ১.২ মিটার ছাড়ার কথা থাকলেও কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি, যা ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২-এর ৩বি ধারার পরিপন্থী। এমতাবস্থায় আগামী সাত দিনের মধ্যে অবৈধ অংশ অপসারণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। ’ এ নোটিশ জারির পর ভবন মালিক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া রাজউক ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে উচ্ছেদ চালায়। কিন্তু উচ্ছেদের পরপরই ভবনটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেন মালিক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উচ্ছেদে অংশ নেওয়া রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এলাকা পরিদর্শনের সময় দেখতে পাই ভবনটি নিয়ম লঙ্ঘন করে নির্মাণ হচ্ছে। এরপর তিনটি ভবন মালিককে পর্যায়ক্রমে তিনটি নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তা আমলে নেননি। সর্বশেষ উচ্ছেদে গেলে সেখানে সরকারদলীয় লোকজন নিয়ে এসে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও রাজউকের লোকজনকে অপদস্থ করেন ভবনের মালিক হাবিবুর রহমান। একপর্যায়ে আংশিক উচ্ছেদ করে আমরা চলে আসতে বাধ্য হই। ’ অনিয়মের পক্ষে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নেতারা এ ধরনের আচরণ করবেন—তা খুব দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন এ কর্মকর্তা।

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘নিয়ম লঙ্ঘিত হওয়ার পর নির্মাণকালীন আমরা রাজউকের পক্ষ থেকে তিতাস গ্যাস, ঢাকা ওয়াসাসহ ইউটিলিটি সার্ভিসের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোকে সংযোগ না দিতে পত্র দিই। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জকেও অবৈধ নির্মাণের ব্যাপারে অবহিত করে পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ এতে সাড়া দেননি। ’

এ বিষয়ে কথা বলতে ভবন মালিক হাবিবুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ম্যানেজার মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমাদের এ বাড়ি নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। তা আমাদের সাহেব (হাবিবুর রহমান) অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে বসে মিলমিশ করে ফেলেছেন। এখন আর কোনো সমস্যা নেই। স্যার কারো সঙ্গে দেখা করেন না। ’

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘রাজধানীতে অনেক ভবনের মালিক ১০ তলার অনুমোদন নিয়ে ১৫ তলা করে ফেলেছেন। নিয়মানুযায়ী খালি জায়গা রাখার কথা থাকলেও তো মানা হচ্ছে না। আমার স্পষ্ট নির্দেশ হলো—অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। এ জন্য কোনো নোটিশ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। ’


মন্তব্য