kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডিএসসিসির ‘ম্যানেজ মাস্টার’ শেহাবের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ!

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ডিএসসিসির ‘ম্যানেজ মাস্টার’ শেহাবের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ!

তিন বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেহাব উল্লাহ। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি বড় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকেও মামলা চলছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি একসঙ্গে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহার করা ও কানাডার নাগরিকত্ব নিয়েছেন এমন অভিযোগেরও সত্যতা মিলেছে। এত কিছুর পরও শেহাব উল্লাহ বর্তমানে ৪৮০ কোটি টাকার প্রকল্পসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্বে

রয়েছেন। ‘ম্যানেজ মাস্টার’খ্যাত শেহাব উল্লাহর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলার ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল এত দিন। গত সপ্তাহে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় বিভাগীয় তিন মামলা চালু হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সাত দিন সময় বেঁধে দিয়েছে শেহাব উল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। এসব তথ্য ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ডিএসসিসির সচিব খান মো. রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেহাব উল্লাহর বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা চালু হয়েছে। এসব মামলা চলার ক্ষেত্রে এত দিন আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। গত সপ্তাহ মামলা চলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর আমরা বিভাগীয় মামলা চালুর ক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মো. বিলাল বলেন, ‘শেহাব উল্লাহসহ আরো কয়েকজনের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর আমরা কী ব্যবস্থা নিয়েছি তা জানতে চেয়েছে। মন্ত্রণালয় আমাদের এ জন্য সাত দিন সময় বেঁধে দিয়েছে। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব। ’

জানা যায়, ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেহাব উল্লাহ একাধারে তিনটি দায়িত্বে রয়েছেন। নির্মল বায়ু ও টেকসই প্রকল্প (কেইস) এবং সানমুন টাওয়ার প্রকল্পে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি  ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন  করছেন। এই তিন প্রকল্পেই শেহাব উল্লাহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর মতিঝিলে নির্মিত হয়েছে ৩০ তলার দিলকুশা কার পার্কিং ও বাণিজ্যিক ভবন। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ ভবন নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে ৮২৭ কোটি টাকার। এ ঘটনায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৫ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিটি। অভিযুক্তদের তালিকায় অন্যতম হচ্ছেন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শেহাব উল্লাহ।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল সিদ্ধান্ত হয় তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে বঙ্গভবনের উত্তরের প্রাচীর ঘেঁষে ৩৭ দিলকুশা প্লটে চার বিঘা জমির ওপর আধুনিক পার্কিং ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করবে। ভবনটি ২৩ তলাবিশিষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও তা ৩০ তলা করা হয়। নাম দেওয়া হয় সানমুন স্টার টাওয়ার। এতে ডিসিসির অসাধু কর্মকর্তা শেহাব উল্লাহ ডেভেলপারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত সাততলা তৈরির সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পড়ে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হলে তদন্ত কমিটি ২৩ থেকে ৩০ তলা নির্মাণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নেওয়াসহ ১৮টি অনিয়ম চিহ্নিত করে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, শেহাব উল্লাহর বিরুদ্ধে কানাডার নাগরিকত্ব নেওয়া ও একই সঙ্গে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের ব্যাপারে বিভাগীয় মামলা চলছে। সেখানে উল্লেখ আছে, শেহাব উল্লাহ কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়ে গোপনে কানাডার ইমিগ্র্যান্ট হয়েছেন। একাধিকবার ছুটি নিয়ে কানাডা অবস্থান করেও কর্তৃপক্ষকে ভ্রমণ-সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তাঁর পাসপোর্ট নাম্বার ঊ ১২১৫৬২৯, অঅ ২১৬৯৮২০, ঙঈ ১০০৬২৩২। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল মেয়াদি এ তিনটি পাসপোর্টে তথ্য বিভ্রাট রয়েছে। এ ছাড়া এ তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি কমপক্ষে ১০ বার কানাডা গেছেন এবং সেখানে অবস্থান করেছেন। ওই সময় কমপক্ষে দুই শ কর্মদিবস তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের চাকরি বিধিমালা মতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ এবং প্রতারণার মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনছার আলী বিস্তারিত তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে শেহাব উল্লার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করেন।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, নির্মল বায়ু ও টেকসই প্রকল্পের (কেইস) আওতায় একসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে। এতে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের এক তদন্তে মোহাম্মদপুর এলাকার সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। এ ছাড়া খিলগাঁও এলাকায় ২৫ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণে ৪৫ কোটি টাকা, মোহাম্মদপুর এলাকায় ২৬ কোটি টাকা, এক কোটি ৮০ লাখ টাকায় রিকশা লেন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক পারাপার রোধে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ, ট্রাফিক সিগন্যাল উন্নয়নে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, শেহাব উল্লাহর বিরুদ্ধে একসঙ্গে তিনটি বিভাগীয় মামলা চলমান আছে। আবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছে। কিন্তু ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো শেহাব উল্লাহকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে।   কোনো এক অদৃশ্য কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে ফাইল নড়াচড়া শুরু হয়েছে। সেখানেও শেহাব উল্লাহকে রক্ষা করতে নানা ফাঁকফোকর খোঁজা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির প্রকৌশলী শেহাব উল্লাহর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। পরে এসএমএস পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্য চাওয়া হলে তা-ও মেলেনি।


মন্তব্য