kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চলে গেলেন প্রবীণ রাজনীতিক অজয় রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চলে গেলেন প্রবীণ রাজনীতিক অজয় রায়

দেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা প্রবীণ রাজনীতিক অজয় রায় মৃত্যুবরণ করেছেন। দীর্ঘদিন নানা রোগে ভুগে গতকাল সোমবার ভোরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে নিজ বাসায় মারা যান তিনি।

তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তাঁর মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে বিদেশে থাকেন। তাঁরা এলে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রামে পৈতৃক বাড়িতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি ও সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সমন্বয়ক অজয় রায় অনেক দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। গত সপ্তাহে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল থেকে তাঁকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এর পরও তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সেখানে চিকিত্সক পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অজয় রায়ের মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন স্ত্রী জয়ন্তী রায়। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুইজারল্যান্ডে এবং ছেলে ও ছোট মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

আগামীকাল বুধবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অজয় রায়ের মরদেহ রাখা হবে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

অজয় রায়ের জন্ম ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রামে। বাবা প্রমথনাথ রায় বারানসী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক ছিলেন। মা কল্যাণী রায়।

অজয় রায় ১৯৪৫ সালে বারানসী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করে কিশোরগঞ্জে ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালে মুন্সীগঞ্জ থেকে বিকম পাস করেন। স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। স্কুলজীবনে ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন শুরু হয়। এরপর ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর প্রতিরোধে, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর আন্দোলন সংগ্রামের সব পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে তাঁর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অজয় রায় মোট ১৮ বছর জেল খেটেছেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় আত্মগোপনে থেকেছেন। বন্দি হিসেবে অনশন করছেন অন্তত চারবার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলে। তৎকালীন ইপিআর সদস্যদের সহায়তায় জনতা তাঁকে মুক্ত করে। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। সেই বছরই তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় রূপান্তরিত কমিউনিস্ট কেন্দ্র। পরে দলের নাম দেন কমিউনিস্ট কেন্দ্র। ২০১০ সালের পর ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি।

অজয় রায় সংবাদপত্রে কলাম লেখার পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, বিভিন্ন আন্দোলনসহ নানা বিষয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এসবের মধ্যে আছে ‘বাঙলা ও বাঙালী’, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান’, ‘বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান’, ‘বাংলার কৃষক বিদ্রোহ’, ‘শিক্ষানবিশীর হাতেখড়ি’, ‘রাজনীতির অ আ ক খ’, ‘পুঁজিবাদী অর্থনীতি’, ‘গণআন্দোলনের এক দশক’, ‘আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা’, ‘বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলন’ ইত্যাদি।

অজয় রায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এবং বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সভাপতি বিমল বিশ্বাস, কার্যকরী সভাপতি মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ এমপি, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রাজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রমুখ।


মন্তব্য