kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাল্যবিয়ে

নতুন পথে কুড়িগ্রাম

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নতুন পথে কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রামে বাল্যবিয়ে বন্ধে হটলাইন সংক্রান্ত প্রচারপত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

বয়স বাড়িয়ে লিখলেই কেল্লা ফতে। বৈধ হয়ে গেল বাল্যবিয়ে।

বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে এ অপকর্মটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। বর, কনে ও কাজি—তিন পক্ষই যখন এ মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তখন তা ঠেকায় কে? ভোটের রাজনীতির কারণে চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও বাল্যবিয়ের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখেন, ক্ষেত্রবিশেষে সহযোগিতাও করেন। ফলে প্রশাসনের পক্ষে বাল্যবিয়ে বন্ধ খুবই চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। একটি উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ জয়ের পথে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন।

সুস্থ জাতি পেতে হলে সুস্থ, সবল ও শিক্ষিত মা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে হলো সেই প্রয়োজনের পায়ে কুড়াল মারা। কারণ কন্যাশিশুরাই হয় এর প্রধান শিকার। এ জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় দারিদ্র্যকে। কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ জেলা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব (২০১৩) মতে, এ জেলায় বাল্যবিয়ের হার ৭৮.১ শতাংশ। এমন একটি জেলায় বাল্যবিয়ে বন্ধ করা আরো চ্যালেঞ্জ বটে। সেই যুদ্ধজয়ের পথে বাল্যবিয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটি ভোঁতা করা, তথা বয়স জালিয়াতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে দ্রুত কমে আসছে বাল্যবিয়ের হার।

গত প্রায় আড়াই বছরে একটি ‘উদ্ভাবনী প্রকল্প’-এর মাধ্যমে সেই যাত্রা শুরু। পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট নম্বরে ‘খুদেবার্তার মাধ্যমে বয়স যাচাই’ এবং তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে ‘হটলাইন চালুর’ মাধ্যমে তা শুরু হয়। এবার এতে যোগ হচ্ছে ‘অনলাইনে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন’, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম। এর বাস্তবায়ন শুরু হবে আগামী ১ নভেম্বর থেকে। পরীক্ষামূলকভাবে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর ও রাজারহাটে প্রথমে এ প্রকল্প চালু হচ্ছে।

ইতিমধ্যে বর-কনের বয়স নিয়ে আইনের চোখে ধুলো দেওয়া বন্ধ হতে শুরু করেছে। অনলাইনে তা আরো বেগবান হবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে বহুবিবাহ বন্ধের মতো আরেক সামাজিক ব্যাধিকেও চোখ রাঙাবে এই পদ্ধতি। কারণ অনলাইনে একবার বিয়ে নিবন্ধন হয়ে গেলে, সেই বর বা কনে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই তথ্য সামনে চলে আসবে।

প্রকল্পের বাস্তবায়ন সমন্বয়ক ও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ওয়ারেছ আনসারী জানান, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির থেকে বাল্যবিয়ের বন্ধ করতে একটি উদ্ভাবনী প্রকল্প চাওয়া হয় জেলা প্রশাসনের কাছে। জেলা প্রশাসন তখন প্রকল্প প্রস্তাব করার পর তা অনুমোদন হয় এবং ওই বছরেরই ১৫ জুন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। প্রকল্পে আংশিক আর্থ সহযোগিতা দেয় এটুআই কর্মসূচির সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন এবং এসএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার সনদ জালিয়াতি করে বিয়ে নিবন্ধন করার ঘটনাও অহরহ ঘটেছে এ জেলায়। কিন্তু প্রকল্পটি চালুর পর জাতীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারিগরি চুক্তির এবং টেলিটক লিমিটেডের মাধ্যমে সব শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের ডাটা সেন্টারের প্রবেশাধিকার পাওয়ার ফলে বয়স যাচাই সম্ভব হয় মোবাইল ফোনেই। পাশাপাশি ১৬১০০ হেল্পলাইনে ফোন করে বিয়ে বন্ধ করতে পারছে অনেক স্কুল শিক্ষার্থী।

সূত্র মতে, এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিটিআরসি থেকে ১৬১০০ নম্বরের একটি শর্টকোড বারাদ্দ দেওয়া হয়। নম্বরটি খুদেবার্তা পাঠানো এবং হটলাইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ তিন উপজেলার লোকজন সম্ভাব্য বর-কনের বয়স জানতে চেয়ে *১৬১০০# নম্বরে ডায়াল করলেই ফিরতি মেসেজে পেয়ে যাবেন প্রয়োজনীয় তথ্য। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সাহায্য পেতে অথবা তথ্য পেতে প্রশাসনের সহযোগিতার জন্য ১৬১০০ নম্বরে ফোন করা যাবে। অর্থাত্ সাহায্যপ্রার্থী কোনো উপজেলার তথ্য পেতে হলে বা জেলা প্রশাসকের কথা বলতে চাইলে ‘নির্দিষ্ট নম্বর চাপুন’ জাতীয় বিকল্প পাবেন।

নাগেশ্বরী উপজেলার নাখারগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা বেগম জানান, কয়েক মাস আগে তার দিনমজুর বাবা দারিদ্র্যের কারণে তার বিয়ের দিন ধার্য করেন। পরে তিনি আশার আলো পাঠশালার সহায়তায় ১৬১০০ নম্বর হটলাইনে যোগাযোগ করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়ে বন্ধ করেন বিয়ে। একইভাবে তার বান্ধবী রমিচা ও হাসিনাও রক্ষা পায়।

নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হালিম সরকার জানান, হটলাইনে ফোন করে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তাত্ক্ষণিক সহায়তা পাওয়ার কারণে গত তিন মাসে প্রায় ৫০টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেছে এই ইউনিয়নে। কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার কাজির দায়িত্বে থাকা খন্দকার মোশতাক আহাম্মদ জানান, মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন যাচাই করে সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ার কারণে বাল্যবিয়ের প্রবণতা অনেক কমে গেছে। অনলাইনে বিয়ে নিবন্ধনের জন্য তাঁদের মোবাইল ফোনও দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পের সহকারী পরিচালক জানিয়েছেন, বিয়ে নিবন্ধনের সময় প্রত্যেক বিয়ে নিবন্ধক নির্দিষ্ট অ্যাপস ব্যবহার করে বর-কনের বয়স নিশ্চিত হওয়ার পর কেবল বিয়ে নিবন্ধন করতে পারছেন। আগামী ১ নভেম্বর কুড়িগ্রামের তিনটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে অনলাইনে বিয়ে নিবন্ধন। এতে অনলাইনে কয়েক ধাপে বিয়ে নিবন্ধন কাজ শেষ হবে। জন্মনিবন্ধন, এসএসসির সার্টিফিকেট অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী কনের ক্ষেত্রে ১৮ এবং বরের ক্ষেত্রে ২১ বছর না হলে এই বিবাহ নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাবে না। আর তথ্য সঠিক হলে অনলাইনে নির্বিঘ্নে বিয়ে নিবন্ধন করা যাবে, যা একটি সার্ভারের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকবে।


মন্তব্য