kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কোটি টাকার দুর্নীতি করেও তিনি চাকরিতে বহাল

কাজী হাফিজ   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



কোটি টাকার দুর্নীতি করেও তিনি চাকরিতে বহাল

কোটি টাকার দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে চাকরি করে যাচ্ছেন সরকারি মালিকানাধীন টেলিফোন কম্পানি বিটিসিএলের পরিচালক (উন্নয়ন সমন্বয়) মো. মিজানুর রহমান। তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও আছে।

তবে চাকরির নিয়ম অনুসারে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস করার ধার ধারেন না তিনি। ইচ্ছামতো অফিসে আসেন, আবার ইচ্ছামতো চলেও যান। অফিসের কাছেই কোটি টাকার নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তিনি।

মিজানুর রহমানের অফিসের একজন কর্মচারীর বক্তব্য, ‘স্যারের মন ভালো নেই। অসদাচরণ ও দুর্নীতি’র অভিযোগে চাকরি যায়নি ঠিকই, তবে প্রমোশন আটকে রয়েছে। ওনার সঙ্গের এবং পরের অনেক কর্মকর্তা জিএম হয়ে গেছেন, কিন্তু উনি হতে পারেননি। আর এ জন্য বেশি সময়ও নেই। ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তিনি অবসরে যাবেন। এ অবস্থায় বাকি সময়টুকু কোনোভাবে পার করতে চান তিনি। তা ছাড়া যে পদে তিনি রয়েছেন সে পদে এখন তেমন কোনো কাজও নেই। ’

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে মো. মিজানুর রহমান সম্পর্কে জানা যায়, তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিটিটিবির (বর্তমানে বিটিসিএল) ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসাবো এবং সাভারে বিভাগীয় প্রকৌশলীর (ফোনস) দায়িত্ব পালনের সময় বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন। বাজেটে বরাদ্দ না থাকার পরও বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ৯৭ লাখেরও বেশি টাকা ব্যয় দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে হতবাক করে দেন। অডিট আপত্তিতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস দেখায়নি। বরং মো. মিজানুর রহমানকে তখন পদোন্নতি দিয়ে পরিচালক করে রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মিজানুর রহমানের ওই দুর্নীতির বিষয়টি আমলে নেওয়া হয় ২০০৯ সালের মাঝামাঝি। এ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। সাভার মডেল থানায় ২০০৯ সালের ২১ জুন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলা নম্বর ৭৭। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও তদন্তও শুরু হয়। কিন্তু এসব মামলা ও তদন্ত মো. মিজানুর রহমানের পরবর্তী প্রমোশনে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও চাকরি বহাল থাকে। তদন্তের ফাইলও থেকে যায় অনেকটা স্থবির অবস্থায়।

২০১৩ সালের শেষ দিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়। মন্ত্রণালয় থেকে এ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তৎকালীন যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (ডাক) মো. রফিকুল ইসলামকে। তিনি মিজানুর রহমানকে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে জবাব দেওয়ার জন্য ওই বছরের ১০ অক্টোবর তাঁর দপ্তরে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি দেন।

ওই চিঠিতে বলা হয়, মো. মিজানুর রহমান রাজশাহী টেলিযোগাযোগ অঞ্চলের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও ২০০১-০২, ২০০৪-০৫, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসাবো ও সাভারে বিভাগীয় প্রকৌশলী থাকার সময় ‘৪৯০০-রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত’ খাতে বিধিবহির্ভূতভাবে বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত মোট ৯৭ লাখ সাত হাজার ছয় টাকা ব্যয় করেন। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫-এর ৩ (বি) ও (ডি) ধারা অনুযায়ী এটি অসদাচরণ ও দুর্নীতি হিসেবে গণ্য।

জানা যায়, মো. মিজানুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। সে আবেদনও নাকচ হয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, বিটিসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম বিপর্যস্ত অবস্থায়। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১৯৯তম সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডাব্লিউ), ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স), পিএসটিএন ও ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটর হিসেবে বিটিসিএলের কাছে বিটিআরসি তথা সরকারের পাওনা এক হাজার ৮৩০ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০০৮ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পাওনার এ পরিমাণ দাঁড়িয়েছে।

কার্যবিবরণীতে বলা হয়, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিসিএলের প্রতি বিটিআরসি সর্বদাই নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে আসছে। যেখানে রেগুলেটর হিসেবে বিটিআরসি থেকে অন্য লাইসেন্সধারী অপারেটরদের ক্ষেত্রে বকেয়া রাজস্ব আদায়ে লাইসেন্স বাতিল, অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ, পিজিবি (পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি) নগদায়ন, পিডিআর অ্যাক্টে মামলা, খেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ/ক্রোক—এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সেখানে বিটিসিএল কর্তৃক সরকারের এত বিপুল পরিমাণের রাজস্ব পরিশোধের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করা কোনোক্রমেই আইনানুগ বা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা রেগুলেটর হিসেবে সব অপারেটরের জন্য সুষম ক্ষেত্র বজায় রাখা টেলিকম সেক্টরের শৃঙ্খলার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বিটিআরসির এই তথ্য ও মন্তব্য সম্পর্কে বিটিসিএলের এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, দুর্নীতি করে শাস্তি পেতে হয়েছে, বিটিসিএল বা আগের বিটিটিবিতে তার নজির কম। এ কারণেই মিজানুর রহমানের মতো কর্মকর্তা নিয়মনীতির ধার ধারতে চান না।

এদিকে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রথমে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তথ্য অধিকার আইন অনুসারে এ প্রতিবেদক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করলে গত রবিবার তার জবাব মেলে। বিটিসিএলের পরিচালক (সংস্থাপন ও প্রশাসন-১) মো. শাহজাহান স্বাক্ষরিত এই লিখিত জবাবে বলা হয়, ‘বাজেট অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য মো. মিজানুর রহমান, পরিচালক (উন্নয়ন সমন্বয়)-কে মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিরস্কার দণ্ড এবং বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয়ে আর্থিক ক্ষতির জন্য ৯৭ লাখ সাত হাজার ছয় টাকা তাঁর কাছ থেকে আদায় করার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। ’ তবে কবে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে তা জানানো হয়নি। অন্যদিকে গতকাল রবিবার বিষয়টি সম্পর্কে টেলিফোনে মিজানুর রহমানের বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের একটি বিষয় সম্পর্কে টেলিফোনে কিছু বলা যাবে না। ’ গত সোমবার দুপুর ১২টার সময় অফিসে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মিজানুর রহমানের অফিস সহকারী ওই সময় বলেন, ‘স্যার হয়তো অন্য কোনো রুমে আছেন। ’ পরে বলা হয়, জোহরের নামাজ পড়ে অফিসে আসবেন। কিন্তু বিকেল ৪টা পর্যন্ত তিনি অফিসে ফেরেননি। এ সময় মোবাইল ফোনেও তাঁর সাড়া মেলেনি। তার আগে বেশ কয়েক দিন দুপুরের পর তাঁকে অফিসে পাওয়া যায়নি। গতকালও তাঁর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।


মন্তব্য