kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তিরোধান দিবস

ছেঁউড়িয়ার বাতাসে লালনের সুর

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ছেঁউড়িয়ার বাতাসে লালনের সুর

ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৬তম তিরোধান দিবসে গতকাল ছেঁউড়িয়ায় শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী উৎসব। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাড়ির পাশে আরশিনগর সেথা এক পড়শী বসত করে—লালনের গান ভেসে এলো কানে। এরপরই ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে...’ একতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরের সঙ্গে মোহিত করা গানের কথা।

গানে-সুরে লালনবন্দনার এমন আয়োজন তাঁরই সাধনভূমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলভক্তরা তাঁদের কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন লালনের রেখে যাওয়া আধ্যাত্মিক গান। তাঁদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে ভক্ত ও দর্শনার্থীরাও। হাজার হাজার লালনভক্তের পদচারণে ছেঁউড়িয়া গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

ছেঁউড়িয়ায় আসা বাউলরা চিরচেনা মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে মত্ত হয়েছেন সাধন-ভজনে। সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়া ছেঁউড়িয়ায় গতকাল রবিবার থেকে শুরু হয়েছে মরমি কবির ১২৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী উৎসব ও বাউল মেলা। স্থানীয় লালন একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করেছে। লালন সাঁইজির দর্শন পাওয়া, তাঁর দর্শনের পথে হেঁটে অচেনাকে চেনা, আত্মার শুদ্ধি, মুক্তি, জ্ঞান আহরণসহ নিজের মনের বাসনা পূরণ করতে এবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উৎসবে যোগ দিতে সাঁইজির ধামে ছুটে এসেছেন বাউলভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থীরা। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা।

গতকাল সন্ধ্যায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর উৎসবের উদ্বোধন করেন। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জহির রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সহসভাপতি রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম প্রমুখ। মুখ্য আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী।

আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব শুরুর আগে থেকেই লালন সাঁইয়ের গানের টানে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে ছুটে এসেছে হাজার হাজার মানুষ। লালন ফকিরের আখড়াবাড়ি ও সামনের বিশাল মাঠ এখন ভক্ত-অনুসারী, সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের পদভারে মুখর। ভক্তদের ভিড় আখড়াবাড়ি ছাপিয়ে পাশের কালীগঙ্গা নদীর পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। উৎসবে আসা হাজারো ভক্ত-অনুসারী ও সাধু-বাউল সাধন-ভজনে মেতে রয়েছেন। আর গুরু-শিষ্যরা লালনের গানের মাঝে খুঁজে ফিরছেন তাঁদের আত্মার আত্মীয়কে। আপন মনে গেয়ে চলেছেন তাঁরা লালনের সব আধ্যাত্মিক গান। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার লালন তিরোধান দিবসে বাউল আর সাধারণের উপস্থিতি অনেক বেশি।

উৎসবের পাশাপাশি হরেক রকমের পণ্যের পসরা নিয়ে লালন একাডেমির বিশাল মাঠে দুই শতাধিক স্টল দিয়ে বসেছে ব্যবসায়ীরা। সেখানে আসবাবপত্র থেকে শুরু করে খই, মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা, জিলাপিসহ নানা পণ্যদ্রব্য এবং কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের পসরা আগতদের নজর কেড়েছে। মেলায় শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলাসহ বিনোদনের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। এ উৎসব চলবে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত। প্রতিবছর মেলা পাঁচ দিন হলেও এবার হচ্ছে তিন দিন।

লালন একাডেমির শিল্পী শিরীন আক্তার বলেন, ‘লালনের গান বিভিন্নভাবে গাওয়া হচ্ছে। এবার উৎসবে আমরা লালনের প্রকৃত সুর ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আমরা লালনের গানের আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরছি তাঁর সুরেই। ’ লালন একাডেমির সদস্য মমিন ফকির জানান, এ আয়োজনে যোগ দেওয়া হাজার হাজার লালন অনুসারী গানের মধ্য দিয়েই এই আধ্যাত্মিক সাধকের বাণী লাখো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন।

লালন মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী সাঁই জানান, সত্য ও সুপথের সন্ধানে মানবতার দীক্ষা নিতে আত্মার টানে দেশ-বিদেশের সাধু-গুরু ও ভক্তরা দলে দলে এসে আসন গেড়েছেন সাঁইজির মাজারে। মূল উৎসব শুরু হওয়ার আগ থেকে আখড়ায় আসা বাউল সাধকরা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা গেয়ে চলেছেন সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদতত্ত্বের গান।

লালন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সেলিম হক জানান, লালনের জাতহীন মানবধর্মে দীক্ষিত হয়ে তাঁর জীবনকর্ম, ধর্ম-দর্শন, মরমি সংগীত ও চিন্তাচেতনা হাতড়ে তা থেকে শিক্ষা নিতে সাঁইজির ধামে ছুটে এসেছেন ভক্ত, অনুসারী, দর্শনার্থীরা। তাঁরা এ উৎসব শুরুর আগে থেকেই মাজার চত্বরে আসন গেড়েছেন। লাখো বাউলভক্তের পদচারণে এখন একাকার ছেঁউড়িয়া ও কালীগঙ্গার পাড়।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম জানান, সুষ্ঠুভাবে এবারের আয়োজন সম্পন্ন করতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে র‌্যাব ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ থাকছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পুলিশের ওয়াচ টাওয়ারসহ নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি জহির রায়হান বলেন, ‘প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী প্রতিবার তিন দিনের এ উৎসব পালিত হলেও মাঝে বেশ কয়েক বছর ধরে তা বাড়িয়ে পাঁচ দিনের করা হয়েছিল। এবার তা আগের মতো তিন দিনে করা হয়েছে। আমরা মনে করি, লালনের অহিংসার বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেবল সার্থক হবে এ আয়োজন। ’

তিন দিনের এ অনুষ্ঠানে লালনের কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা ছাড়াও রাতভর লালন মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরাসহ লালন একাডেমির শিল্পীরা।

উল্লেখ্য, বাংলা ১২৯৭ সনের ১ কার্তিক ও ইংরেজি ১৮৯০ সালের ১৬ অক্টোবর সাধক লালন সাঁই ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন। এর পর থেকে লালনের অনুসারীরা প্রতিবছর এখানে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে আসছেন।


মন্তব্য