kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংক

সম্পর্কের নয়া সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু নিয়ে ঝগড়া এখন অতীত

পার্থ সারথি দাস   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সম্পর্কের নয়া সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও প্রতিশ্রুত ঋণ প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। চার বছরে সে ব্যবধান কমেছে।

সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছতে যাচ্ছে।

২০১২ সালের জুনে পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি ডলারের ঋণ প্রত্যাহার করেছিল বিশ্বব্যাংক। এরপর বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় এবং শুরুও করে। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ সন্তোষজনক গতিতে চলছে।

ঋণ প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের টানাপড়েন চরমে পৌঁছে। বছরখানেক সময় দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে সংস্থাটি। পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় বাড়িয়ে দেয় বিশ্বব্যাংক। আস্তে আস্তে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে শুরু করে।

‘নবায়িত’ সম্পর্কের এই অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম আজ রবিবার তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। তাঁর সফরের মধ্য দিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছবে বলে আশা করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

বাংলাদেশ সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ৩৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ সেতুর অবকাঠামো, সংযোগ সড়ক ও নদীশাসনের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগের জন্য নেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পে চীন সরকার অর্থায়ন করবে।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থার আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই চলছে সেতুর কাজ। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সরকারের এ কর্মযজ্ঞ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পকে ঘিরে সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি এখন পুরনোই বলা চলে। এখন সামনের দিকে তাকাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের আগের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশে সংস্থাটির আর্থিক সহায়তা বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে এর অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল ১৯০ কোটি ডলার।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ১১৬ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এর আগে কখনো সংস্থাটি এক বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড় করেনি। এগুলো সম্পর্কের উন্নয়নের নির্দেশক। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থসহায়তার শতভাগ ব্যবহৃতও হচ্ছে। আগে এ অবস্থা ছিল না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বিশ্বব্যাংকের তরফ থেকে বাংলাদেশ ১২০ কোটি ডলারের মঞ্জুরি সহায়তা পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের মূল লক্ষ্য সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশের অগ্রগতি। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট রবার্ট বি জোয়েলিক দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁর সময়েই পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ঋণচুক্তি হয়েছিল। তাঁর আমলেই তা বাতিল হয়েছিল।

সংস্থাটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। তিনি বাংলাদেশের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিশ্বব্যাংক সূত্র জানায়, দারিদ্র্য বিমোচন ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজের চিত্র নিজের চোখে দেখতে তিনি এ দেশে আসছেন।

২০১১ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কারণে তা পিছিয়ে যায়। নতুন করে দরপত্র আহ্বানসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর মূল সেতু ও অন্যান্য অংশের কাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল সেতুর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তার কাছে হেরে যায় বিশ্বব্যাংক।

গত ডিসেম্বরে ঢাকায় এসে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছিলেন, সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সরকারি বাসভবনে বৈঠকের পর তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ এত দিন স্বল্পোন্নত দেশ ছিল। এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন নতুন মানদণ্ডে উন্নীত হবে, অনেকটা পার্টনারশিপের মতো। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বব্যাংককে পার্টনার বলেই মনে করি। পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে যা হয়েছিল সেটা এখন অতীত। ’


মন্তব্য