kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢামেক চত্বরে ঘাতক হয়ে উঠল অ্যাম্বুল্যান্স

অন্তঃসত্ত্বা, মা-ছেলেসহ চারজনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অন্তঃসত্ত্বা, মা-ছেলেসহ চারজনের মৃত্যু

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গতকাল অ্যাম্বুল্যান্সের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহতদের একজনের স্বজনের আহাজারি। ইনসেটে ঘাতক অ্যাম্বুল্যান্স। ছবি : কালের কণ্ঠ

পটুয়াখালীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়া সাত বছরের শিশুপুত্র সাকিবকে চিকিৎসা করাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন মা। সন্তানের জীবন বাঁচাতে যে হাসপাতালে এলেন, সেই হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভেতরেই আরেক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন সেই মা ও ছেলে।

এ ছাড়া স্বামীর চিকিৎসা তদারকিতে একই হাসপাতালে এসেছিলেন অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ আমেনা বেগম সূর্যি। একই দুর্ঘটনায় তাঁর গর্ভের অনাগত সন্তান এবং কয়েক ঘণ্টা পর তিনি নিজেও মারা যান। তাঁদের সঙ্গে প্রাণ হারান হাসপাতাল গেটের অজ্ঞাতপরিচয় এক ভিক্ষুক। মাস তিনেক পরেই আমেনার সন্তান পৃথিবীতে আসার কথা ছিল।

গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এ তাণ্ডব ঘটায় একটি অ্যাম্বুল্যান্স। দ্রুতগতির অ্যাম্বুল্যান্সটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিকশা ও পথচারীদের চাপা দিলে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরো ছয়জন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘাতক অ্যাম্বুল্যান্সের চালককে আটক করা হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্সের হেলপার হলেও সে ঘটনার সময় সেটি চালাচ্ছিল।

নিহতরা হলো মোসাম্মদ গোলেনূর বেগম (২৭), তাঁর সাত বছরের সন্তান মোহাম্মদ সাকিব, অজ্ঞাতপরিচয় এক ভিক্ষুক (৪৫), আমেনা বেগম সূর্যি ও তাঁর গর্ভে থাকা সন্তান। এ ঘটনার পর পুরো হাসপাতালে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে (পুলিশ বক্সসংলগ্ন) মানবসেবা নামের একটি অ্যাম্বুল্যান্স (সিলেট-ছ-৭১-০০৬৪) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি রিকশাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও দর্শনার্থীদের ওপর উঠে যায় অ্যাম্বুল্যান্সটি। দুর্ঘটনাকবলিতদের আর্তচিত্কারে পুলিশ ও আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক অজ্ঞাতপরিচয় ভিক্ষুক ও সাত বছরের শিশু সাকিবকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা আমেনা বেগম সূর্যি, তাঁর পাঁচ বছরের সন্তান সজীব, মোসাম্মদ গোলেনূর বেগম ও তাঁর সাত মাসের শিশু সন্তান আকাশ, রামজান আলী (৩০), রিকশাচালক মো. মাহতাব (৫০) ও বাচ্চু মিয়াকে (৩০) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল পৌনে ৩টার দিকে গোলেনূর বেগম মারা যান। এর পরপরই অস্ত্রোপচার করে আমেনা বেগমের গর্ভের সন্তানকে বের করে আনা হয়। পরে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমেনা বেগমের মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, নিহত গোলেনূর বেগমের স্বামীর নাম ফেরদৌস মিয়া। তাঁদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালির বাইদা এলাকায়। ফেরদৌস গ্রামের বাড়িতে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। তিনি জানান, দুই দিন আগে ছেলে সাকিব একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মাথায় আঘাত পায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য শুক্রবার ঢাকায় আনা হয় তাকে। সূত্রাপুরে শ্যালক ফারুক হোসেনের বাসায় ওঠেন ফেরদৌস, সঙ্গে স্ত্রী গোলেনূর, দুই ছেলে সাকিব ও আকাশ। গতকাল সকালে শ্যালকসহ তারা চারজন রিকশাযোগে ঢামেকের জরুরি বিভাগের গেটের সামনে আসে। রিকশা থেকে নেমে তারা হেঁটে টিকিট কাউন্টারে যাচ্ছিল। এই সময় পেছন থেকে একটি অ্যাম্বুল্যান্স দ্রুতগতিতে এসে তাদেরসহ অন্যদের ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলে মারা যায় ছেলে সাকিব। আহত হয় স্ত্রী গোলেনূর ও ছেলে আকাশও। ছেলেকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফেরদৌস। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর স্ত্রীর মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে যান তিনি। তাঁর সাত মাস বয়সী শিশু আকাশ ভাঙা পা নিয়ে বর্তমানে ২০৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এখন তাকে নিয়েও ভয়ে আছেন ফেরদৌস। একপর্যায়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন ফেরদৌস। তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন শ্যালক ফারুক হোসেন।

ফারুক হোসেন বলেন, ‘সাকিবের আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না। ভালো চিকিৎসার জন্যই আমার কথামতো ঢাকায় এসেছিল তারা। ঘাতক অ্যাম্বুল্যান্সটি সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। শিশু আকাশ শুধু মাকে খুঁজছে। সন্তান ও স্ত্রীকে হারিয়ে দুলাভাই পাগল হয়ে গেছেন। তাঁকে কিছুতেই সান্ত্বনা দেওয়া যাচ্ছে না। এখন বোন ও ভাগিনার লাশ বহন করার শক্তি আমার কই?’ এ কথা বলেই তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।    

শুধু ফেরদৌসের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেনি এ দুর্ঘটনায়। তাঁর মতো জাকির হোসেনের স্বপ্নও মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। অ্যাম্বুল্যান্সটির চাপায় গর্ভের ছয় মাসের সন্তানকে হারিয়েছেন জাকির হোসেন ও আমেনা বেগম সূর্যি দম্পতি। গর্ভের সন্তানের পর গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন সূর্যি। সন্ধ্যায় ডাক্তার তাঁকেও মৃত ঘোষণা করেন।

জাকির হোসেনের পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্র সজীব এখন চিকিৎসাধীন আছে। ট্রাকচালক জাকির হোসেন জানান, গত ২৫ আগস্ট চট্টগ্রামে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। এখন ঢামেকের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন তিনি। নিজে অসুস্থ, এর মধ্যে স্ত্রী আর অনাগত সন্তান হারানোর ঘটনায় দিশাহারা জাকির হোসেন। জাকির হোসেন জানান, স্ত্রী আমেনা বেগম সূর্যি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। হাসপাতালে স্ত্রীই তাঁকে দেখাশোনা করছিলেন। সজীব ছোট হওয়ায় সেও হাসপাতালে মা-বাবার সঙ্গে ছিল। সকালে স্ত্রী ছেলে সজীবকে নিয়ে তাঁর জন্য রক্তের টিউব ও নাশতা কিনে আনতে বাইরে বের হয়। সেই সময়ই স্ত্রী ও সন্তান অ্যাম্বুল্যান্সের নিচে চাপা পড়ে।

স্ত্রী সাথী আক্তারকে ডাক্তার দেখাতে এনে এই ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন রমজান আলী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রমজানের পরিস্থিতি সংকটাপন্ন নয়। এ সময় রমজানের স্ত্রী সাথী আক্তার ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, ‘আমাদের কোথাও নিরাপত্তা নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছি, এখানেও নিরাপদ না। ’

তবে বিষয়টি ‘শুধু একটি দুর্ঘটনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, যে অ্যাম্বুল্যান্সটি চালিয়েছিল, সে চালকের সহকারী। কিন্তু সে (সোহেল) এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি। কেন সে এটা চালাচ্ছিল, তা পুলিশ নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ বাচ্চু জানান, অ্যাম্বুল্যান্সটি বেসরকারি। চালকের সহকারী সোহেল তখন ড্রাইভ করছিল। একটি লাশ আনার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সটি হাসপাতালে ঢোকার চেষ্টা করে। হেলপার সোহেলকে আটক করে শাহবাগ থানা

পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তিনি জানান, নিহত অপর ব্যক্তির নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তবে তিনি প্রতিদিন হাসপাতালের গেটের সামনে বসে ভিক্ষা করতেন। জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. জেসমিন নাহার জানান, আহত অবস্থায় ৯ জন ভর্তি আছে। মাহাতাব, আফজাল ও ডালিয়া আক্তার নামের তিনজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।

এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। দুর্ঘটনার বিষয়টি তাঁকে অবহিত করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িত অ্যাম্বুল্যান্সটি বেসরকারি। এর চালক দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তাকে পুলিশ আটক করেছে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিকী জানান, অ্যাম্বুল্যান্সের চালক ও মালিককে আইনের আওতায় আনা হবে। হেলপার দিয়েই অ্যাম্বুল্যান্সটি চালানো হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, চালক অ্যাম্বুল্যান্সটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তার পরও অন্য কোনো কারণ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অ্যাম্বুল্যান্সটির মালিক হলেন মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি। তিনি হাসপাতালের একজন স্টাফ। তবে ঘটনার পর থেকে তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য