kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১৯৮ নারীর অর্জন

ক্ষুধা নেই রাকুদিয়ায়

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ক্ষুধা নেই রাকুদিয়ায়

বরিশালের বাবুগঞ্জের রাকুদিয়া গ্রামের স্বাবলম্বী কয়েকজন নারী। ছবি : কালের কণ্ঠ

ক্ষুধামুক্ত জীবন। অভাবমুক্ত সংসার।

সমৃদ্ধির একটি গ্রাম। গ্রামের নাম রাকুদিয়া। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়ে যায় গ্রামের গৃহবধূ শিউলী বেগমের। অভাবকে বিদায় জানিয়ে এখন সফল নারী উদ্যোক্তা তিনি। পরিবারে শীর্ষ উপার্জনক্ষম নারী। সংসার সামলিয়ে নিজের গড়ে তোলা খামারের পরিচর্যা করে দিন কাটে তাঁর। সকালে পুকুর থেকে মাছ ধরা হয়। ফার্ম থেকে জোগাড় হয় মুরগির ডিম। ক্ষেত থেকে তোলা হয় সবজি। এসব নিয়ে স্বামী আনিচ ফরাজি বাজারে যান। বিক্রি করে যে টাকা আসে তা দিয়ে সমিতির সঞ্চয় হয়। দেওয়া হয় লোনের কিস্তি।

শিউলী বেগম একা নন, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের ১৯৮ জন নারী এখন স্বাবলম্বী। কিভাবে? সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ)—অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় গ্রামের এসব নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলে সংস্থাটি। ‘নতুন জীবন লাইভলিহুড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (এনজেএলআইপি)’ নামের একটি প্রকল্প এই গ্রামে চলমান। আগামী ১৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের গ্রামটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে।

রাকুদিয়া গ্রামে একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারাদের রাজত্ব ছিল। সেই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল লতিফ ফরাজী। পেশায় কৃষক। বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ। বংশপরম্পরায় তাঁর দুই ছেলে ইউনুস ফরাজী আর দানিস ফরাজী সংসারের হাল ধরেন। জমি ভাগ হওয়ায় দুই পরিবারের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছেলের বউ সনিয়া আক্তার ও শান্তা বেগম এসডিএফের সদস্য হন। মুষ্টিচাল বাঁচিয়ে সপ্তাহে ১০ টাকা দক্ষিণ রাকুদিয়া সমিতিতে জমা করেন।

ফরাজীবাড়ির প্রবেশদ্বারেই এক একর আয়তনের বিশাল পুকুর। গোসল ছাড়া অন্য কোনো কাজে সেটি কেউ ব্যবহারই করত না। সমিতির মাধ্যমে ফরাজীবাড়ির আট নারী পুকুরটিতে মাছ চাষের উদ্যোগ নেন। সে অনুযায়ী তাঁরা ঋণ নিয়ে যৌথভাবে রুইজাতীয় মাছ চাষ শুরু করেন। এক বছরেই ঋণ পরিশোধ করে লাভের ৫০ হাজার টাকায় পুকুরে ঘাট নির্মাণ করেন। পরবর্তী বছর লাভের টাকায় বাড়ির অঙিনায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে গভীর নলকূপ স্থাপন করেন। এ ছাড়া মাছ বিক্রির টাকায় সংসারের অভাব দূর হতে থাকে।

গ্রামের শিউলী ও কহিনুর বেগমের ছিল অভাবের সংসার। তাঁদের স্বামীরা কৃষক। বছরের আয়ে সংসার চলত না। সমিতি থেকে দুজনেই ২০১৩ সালে ১০ হাজার টাকা করে ঋণ নেন। ধার আর বিয়ের স্বর্ণালংকার বিক্রির ৬০ হাজার টাকা দিয়ে দুটি গাভি ক্রয় করেন। ৫১০ টাকা হিসাবে এক বছরেই সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। পরবর্তী সময়ে একইভাবে ঋণের টাকায় দুজনে আরো দুটি গাভি ক্রয় করেন। দুজনের এখন তিনটি করে গাভি রয়েছে। তা থেকে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ১৬ লিটার দুধ পান।

শিউলী ও কহিনুর বেগম জানালেন, গাভীর মিনি ফার্ম থেকে সংগৃহীত গোবর থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি করেন। সেই সার নিজেদের সবজির ক্ষেতে ব্যবহারের পাশাপাশি সার বিক্রির মাধ্যমেও বছরে অন্তত ১২ হাজার টাকা আয় করেন। এ ছাড়া গোবর মাছের খাবার হিসেবেও ব্যবহার করেন। দুজনের ঘরেই আছে দেশি জাতের মিনি মুরগির ফার্ম। সেখান থেকে বছরে অন্তত ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। আয়ের পাশাপাশি তাদের পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও মেটানো হচ্ছে। সমিতিতে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় রয়েছে। এ ছাড়া তিন লাখ টাকা মূল্যের গাভি রয়েছে।

গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সনিয়া আক্তার ও শান্তা বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। কিন্তু সময় পাল্টেছে। আমরা সমিতির মাধ্যমে সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি পেয়েছি। বিষয়টি আমাদের পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের সকলেই জেনেছেন। এখন সমিতি নিয়ে কেউ বাজে মন্তব্য করেন না। আমাদের পরিবারের সন্তানরা সকলেই এখন স্কুলে যায়। ’ 

গ্রামের স্বাবলম্বী নারী শিউলী বেগম বলেন, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম আর সবজি সবই উৎপাদিত হচ্ছে তাঁর ঘরে, যার বড় একটি অংশ বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটান। পাশাপাশি খাবার হিসেবেও তা ব্যবহার করেন। তাঁর সংসারের আয় আর পুষ্টি দুটিই বেড়েছে। আগে দুই বেলা আধপেটা খেয়ে তাঁদের জীবন চলত। সেসব এখন অতীত।

নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমার গোয়ালে তিনটি গরু আছে। প্রতিদিন অন্তত আট লিটার দুধ দেয়। খামারে আছে অর্ধশত মুরগি। পুকুরে ভরা মাছ । স্বামীর চেয়ে আমার আয় বেশি কয়েক গুণ। ’

শুধু শিউলী আর নাসিমা নন, তাঁদের মতো ফিরোজা, মমতাজ, সনিয়া, শান্তা আর কহিনুরের অবস্থাও একই। তাঁরা দলীয়ভাবে যৌথ পুকুরের রুইজাতীয় মাছের মিশ্র চাষের পাশাপাশি গাভি পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

এ ব্যাপারে এসডিএফের দেহেরগতি ইউনিয়নের সমন্বয়কারী (ক্লাস্টার ফ্যাসিলিটেটর) নকিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনিয়নের এক হাজার ৮৪৭ জন নারী সমিতির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সমিতিতে সঞ্চয়ের পাশাপাশি তাঁরা ঋণ নিয়ে গাভি পালন, মুরগি পালন, মাছ চাষ ও কৃষিকাজের মাধ্যমে নিজ নিজ স্থানে স্বাবলম্বী হয়েছেন। অনেক পরিবারেই তাঁরা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন। নারীরা পরিবারে আয়ের পাশাপাশি পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন দারিদ্র্য কমছে, ঠিক তেমনিভাবে নারীরা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন। দারিদ্র্য জয়ের এ চিত্র দেখতে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ১৮ অক্টোবর দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামে আসবেন। ’

দেহেরগতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলেন, ‘দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়নের এক হাজার ৮৪৭টি পরিবারে সমৃদ্ধির সুবাতাস বইছে। প্রতিটি পরিবারেই নারীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। এভাবে পুরো ইউনিয়নে প্রকল্পের ব্যাপ্তি ঘটালে দারিদ্র্য থাকবে না। ’


মন্তব্য