kalerkantho

বুধবার। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ১০ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ খাদ্য বহুদূর

আশরাফুল হক রাজীব   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ খাদ্য বহুদূর

এখন খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। তবে এই সাফল্যকে টেকসই করার বিষয়ে সরকার যতটা মনোযোগী ততটা নয় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে সরকার অঢেল টাকা দিচ্ছে, গবেষণা করাচ্ছে। আর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাঁদের কাজ, তাঁদেরই গবেষণার আকাল। নেই জনবল আর বাজেটও। তাঁরা শুধু দালানকোঠা সাজিয়ে বসে আছেন। এসব কারণে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৩ সালে খাদ্য নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ নামে একটা আইনের অধীনে আনে। এর আওতায় গঠন করা হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে কাজ করার লোকের বড্ড অভাব। যেখানে প্রায় এক হাজার জনবল থাকার কথা সেখানে আছে মাত্র আটজন। তাঁরাও আবার বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রেষণে এসেছেন। মেয়াদ শেষে তাঁরা আবার নিজ নিজ সংস্থায় ফিরে যেতে চাচ্ছেন।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গতকাল শনিবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করাও দরকার। সরকার সে চেষ্টাও শুরু করেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই তারা প্রত্যাশিত জনবল পাবে। এরই মধ্যে সংস্থাটির জন্য বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। ’

পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ভোক্তার স্বার্থ রক্ষাকারী এ সংস্থাটিও কাগজে-কলমে। জনবলের অভাবে এটি কাজ করতে পারছে না। এর নিয়োগ বিধিমালাও হয়নি। রাজধানীর কিছু বাজারকে ফরমালিন মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তদারকির অভাবে এগুলো আবার আগের অবস্থানেই ফিরে গেছে। উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যকার্যক্রম তদারকি করেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা। এসব পদেও পর্যাপ্ত জনবল নেই।

ভেজালবিরোধী কাজ পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। কিন্তু মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য তাদের বসে থাকতে হয় পুলিশের অপেক্ষায়। অনেক সময় তা পাওয়া যায় না। গত বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের অধীনে স্থায়ী পুলিশ নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে আজো তার সুরাহা হয়নি। তাছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও ভেজাল প্রতিরোধের বিষয়ে অগ্রগতি খুব সামান্যই।

বাংলাদেশের খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন সর্বত্র। খাদ্য নিরাপত্তাকে পাশ কাটিয়ে এখন আলোচনার মুখ্য বিষয় নিরাপদ খাদ্য। খাবারে ভেজালের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য চালান ফেরত এসেছে নিরাপত্তার অজুহাতে। খাবারে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। ফল দ্রুত পাকাতে দেওয়া হচ্ছে কারবাইড। সবজিতেও ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট দেশের ৫০ শতাংশ খাদ্য পণ্যে ভেজাল পেয়েছে। সংস্থাটি এমন কিছু খাদ্যও পেয়েছে যার পুরোটাই ভেজাল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে প্রায় সব ধরনের খাবারে ভেজাল ও বিষের প্রয়োগ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। শাক-সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, ফলমূল এমনকি শিশু খাদ্যেও পাওয়া যাচ্ছে স্বাস্থ্যহানিকর নানা রাসায়নিকের উপস্থিতি। ভেজালের দাপটে খাদ্য উত্পাদনের বিপুল সাফল্যই ম্লান হতে বসেছে। ’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে। খাদ্য ক্রয়ে জনগণের আর্থিক সামর্থ্যও বেড়েছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিমানের অভাবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা তালিকায় দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের ৪৯ শতাংশ আমিষের চাহিদা পূরণ হয় শুধু ভাত থেকে। গ্রামীণ ও শ্রমজীবী মানুষের মাছ, মাংস, দুধ, ডিম কেনার ক্ষমতা কম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড ধানের পর এখন ‘গোল্ডেন রাইস’ যুগে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। যদিও জেনিটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ খাদ্যমান সমৃদ্ধ এসব খাদ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিজ্ঞানিরা মানবদেহে এসব খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে এখনো একমত হতে পারেননি। তার পরও মানের বিষয় বাদ দিয়ে পরিমাণের দিকটি বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ কৃষি উত্পাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এ সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশ এখন চাল রপ্তানিকারক দেশ। যদিও এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ গত কয়েক বছরে সরকারিভাবে না হলেও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর চাল আমদানি হয়েছে। চালের আমদানি ঠেকাতে সরকার ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে। চলতি বছর এ শুল্ক উঠিয়ে দেওয়ার জন্য একটি মহলের চাপ রয়েছে বলে একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন। তাদের কারসাজিতেই বর্তমানে চালের বাজার অস্থির বলে তিনি জানান।

ধারাবাহিক ভর্তুকি, ধানের সংগ্রহ মূল্য বৃদ্ধি এবং সারের দাম কমানোসহ প্রণোদনামূলক নানা উদ্যোগে বাংলাদেশ চাল উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি। তবে সে ধারা গেল কয়েক বছরে নিম্নমুখী। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক দি ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্ট ইউনিট (ইআইইউ) তিন বছরের গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেক্সে জানিয়েছে, ২০০৯ সালে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার হার ছিল ৮৫ শতাংশ। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৮৩.৬ শতাংশে।   ২০১১ সালে ৮২.৬, ২০১২ সালে ৭৯.৪ এবং ২০১৩ সালে ৭৯ শতাংশে দাঁড়ায়। গত কয়েক বছরে খাদ্যশস্য বিশেষ করে চাল উত্পাদনে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের অনিহার কারণে খাদ্য উত্পাদনে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না বলে সংস্থাটি মনে করে।


মন্তব্য