kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

শেখ হাসিনা আস্থার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছেন

আবুল কাশেম   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শেখ হাসিনা আস্থার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছেন

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতে যান ১০৩৮ সালে, সেখানকার বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মশিক্ষার প্রসারের জন্য। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

তাঁর তিব্বত-যাত্রা সম্পর্কের প্রগাঢ়তা ও প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। অবশ্য তারও আগে থেকে চীনের সঙ্গে বাংলা অঞ্চলের বণিকদের যোগাযোগ ছিল।

চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান। ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ দুই দেশের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছে। চীনের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক আড়াই হাজার বছরের পুরনো। স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের চার দশকে এ বন্ধন বহুমাত্রিকতা পেয়েছে। চীন এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় অংশীদার।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফর বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরো দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়ে সাদর অভ্যর্থনা পান। সম্পর্কের নতুন মাত্রার শুরু তখনই। ২০১০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চীন সফর করেন। ওই বছরই শি চিনপিং উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন। চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা তখন থেকে বাড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন সরকার শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের সঙ্গেও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে শুরুতেই। ২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন ফোরামে ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্পষ্ট করেছেন যে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চীন সরকার স্বস্তিবোধ করে। বিএনপি সরকারকে চীনারা পশ্চিমামুখী মনে করেছে।

আধুনিক চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা সফর করেন। প্রেসিডেন্ট লিউ শাও চি ১৯৬৬ সালে ঢাকায় আসেন। স্বাধীনতার আগে  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চীন সফর করেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও জে দং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ও মার্শাল চুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয় দেশটি।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় চীন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উষ্ণ হয়। জিয়া চীন সফর করেন। প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে লি শিয়ানিয়ান বাংলাদেশ সফর করেন এরশাদ সরকারের সময়, ১৯৮৬ সালে। সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয় ১৯৯১ সালে, খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী। ওই সময় খালেদা জিয়াও চীন সফর করেন। বলা যায় বাংলাদেশের সঙ্গে আধুনিক চীনের সহযোগিতার সম্পর্কের পুনঃস্থাপন ও বিকাশ বিএনপি সরকারের হাত ধরে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার কারণে বিএনপি তখন পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। তবে বিপত্তি দেখা দেয় ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর। কয়েকটি ঘটনায় মধুর সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয়। চীন সরকারের বিরূপ মনোভাব এখনো দূর করতে পারেনি বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০২ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চীন সফর করেন। তাঁকে ঊষ্ণ সংবর্ধনা জানায় চীন সরকার। ওই মেয়াদে চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান চীনের শর্ত মেনে ঋণ না নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট গ্রহণে আপত্তি জানালে বৈঠক থেকে রাগ করে চলে যান চীন সরকারের কর্মকর্তারা। সেবার প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ তিনটি চুক্তি হয়। দুটি চুক্তি হয়নি। ২০০৩ সালে ঢাকায় তাইওয়ানের প্রতিনিধি কার্যালয় (রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস) খোলার অনুমতি দেয় খালেদা সরকার। চীন সরকার তাইওয়ানকে নিজের অংশ মনে করে, ফলে এটি মেনে নিতে পারেনি তারা। ২০০৪ সালের ১ মার্চ তাইওয়ান বাংলাদেশে প্রতিনিধি কার্যালয় খোলে এবং কিছুদিনের মধ্যেই ভিসা দেওয়া শুরু করে।

বিষয়টি জানার পর ঢাকার চীনা দূতাবাস তাইওয়ানের কার্যালয় বন্ধ করে দিতে সরকারকে চাপ দেয়। চীনের রাষ্ট্রদূত চাই শি বলেন, প্রতিনিধি কার্যালয় বন্ধ না করলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ সরকার এক চীন নীতিতে বিশ্বাস করলে ঢাকায় তাইওয়ানের কার্যালয় থাকতে পারে না। ওই ঘটনায় বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ অপসারিত হলেও বিএনপির ওপর থেকে চীনের রুষ্ট ভাব দূর হয়নি।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ২০০৪ সালে আবার চীন সফরে যান খালেদা জিয়া। যাওয়ার আগ মুহৃর্তে তিনি ঢাকায় তাইওয়ানের প্রতিনিধি অফিস বন্ধ করেন। বিষয়টি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায় ঢাকা। কিন্তু দূরত্ব কমেনি। এবারের সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বৈঠক করেন। তবে সম্পর্কের তিক্ততা কতটুকু দূর হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে যখন দূরত্ব তৈরি হয়, তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা (২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর) চীন যান। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ওই সফরেই চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। শেখ হাসিনার নির্দেশনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সহজেই চীনাদের সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের শর্ত মেনে নেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ, নদীশাসন ও রেল সংযোগের কাজ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রভৃতি বড় প্রকল্পের কাজ পায় চীনা কম্পানি। এসবের মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে হাসিনা সরকারের আস্থার সম্পর্ক উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে। ২০১৪ সালে আবার সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমেই চীন যান। ওই সফরে ২০টি বিষয়ে সহযোগিতার জন্য একমত হন দুই দেশের নেতারা।

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—উভয়ের সঙ্গে চীন সফর করেছেন সাম্যবাদী দলের নেতা দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা কমছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাড়ছে, বিষয়টিকে এভাবে দেখা উচিত নয়। বরং এটা বলা যায় যে ২০১০ সালের পর বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে শিল্পসমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন, তার জন্য যা দরকার আমরা চীনের কাছ থেকে তা আশা করি। ’

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, গত ছয় বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি হলে পুরো অঞ্চলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আবেগের ওপর নির্ভর করে না, বাস্তব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বর্তমান সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে। বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তারা চীনের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব অত্যন্ত দক্ষভাবে প্রভাবশালী সব শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এটি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বড় সাফল্য।

ড. দেলোয়ার বলেন, ২০১০ সাল থেকে বর্তমান সরকার উপলব্ধি করছে যে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। এর জন্য চীন ছাড়া আর কোনো দেশ নেই। ভারতের নিজের চাহিদাই অনেক। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মন্দাক্রান্ত। জাপানও মন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিপরীতে চীন বিভিন্ন দেশে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অতএব চীনকে পাশে পাওয়া জরুরি। তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থানও দৃঢ় হবে।


মন্তব্য